শিরোনাম

মতামত

প্রসঙ্গঃ ‘ঈদ’ না ‘ইদ’ : বাংলা একাডেমি নিজেই অসংগত

Nazmul Islam

নাজমুল ইসলাম

দেশের মানুষের রক্ত আর ঘামঝরানো টাকায় পোষা হয় বাংলা একাডেমির কর্মকর্তাদের। তাদের কাজ সময় ও পারিপার্শ্বিকতার নিরিখে ভাষার গবেষণা-উন্নয়ন। কিন্তু তারা এর কতটুকু করছেন; বৎসরে একটা মেলার আয়োজন করেন। এতে স্টল পেতে হলে দেখা যায় তাদের রাজনৈতিক তোষণের গভীরতা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় দলবাজিই তাদের প্রধান কাজ, নেশা ও পেশা। সম্প্রতি তাদের সুমহান গবেষণাযজ্ঞের কথা জানতে পারলাম। ‘ঈদ’ বানানে ‘ইদ’ হবে। ঈদের ‘ঈ’ দিয়ে নয়, ইতরের ‘ই’ দিয়ে! এরা বাংলা বানানের নিয়মে এক বাইবেলীয় বিধান সংযুক্ত করেছিলেন, “বিদেশি শব্দে ঈ-কার থাকবে না , তদস্থলে ই-কার দিতে হবে।” কেন থাকবে না এর সঠিক ব্যাখ্যা নেই। এই ভিত্তিহীন নিয়ম অনুযায়ীই ‘ঈ’ স্থলে ‘ই’ লিখতে হবে। জলের মত সহজ আইন । এ আইন অনুযায়ীই ঈদ বানানে ‘ই’ সংগত, আর ‘ঈ’ অসংগত। না মানার কী আছে। কেউ না মেনে পাণ্ডিত্য দেখাতে চাইলে জামাতি তকমা তো আছেই। ইতোমধ্যেই ডিজি সাহেব বলেও ফেলেছেন যে, জামাতিরাই নাকি এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করছে। বিদেশি শব্দের বানান, অর্থ ও ব্যুৎপত্তির দিকে না তাকিয়ে এরকম গাঁজাখুরি বিধান চালু করলে আফ্রিকার জঙ্গলবাসীও মেনে নিবে না। অবশ্য একাডেমি দুই যুগ ধরে নিজেই এ আইন লঙ্ঘন করে তাদের সব বই ও সাইনে ‘বাংলা একাডেমী’ লিখে আসছিল। কত উপহাস্য এ প্রতিষ্ঠানটি। নিজেরাই নিজেদের প্রণীত বিধান মানে না। ডিজি সাহেব তো প্রধানমন্ত্রীর প্রিয়ভাজন। তিনি ঈদটা যেভাবে ইদ করলেন, সে নিয়মে তো আওয়ামী লীগও ভুল শব্দ; এটা শুদ্ধ করে আওয়ামি লিগ লিখতে বলুন, দেখি তার বিধান কথটা কার্যকর হয়। ভণ্ডামিরও একটা সীমা থাকা দরকার। এ অবস্থায় কী করবে দেশের শিক্ষিত সমাজ; সব জায়গায় জবরদস্তি চালিয়ে অজ্ঞানতার অন্ধকারে ঠেলে দেয়া হচ্ছে নতুন প্রজন্মকে। বলা হচ্ছে ভাষার সহজীকরণ হচ্ছে; বিশেষত বাচ্চাদের জন্য। এভাবে না জেনে না বুঝে হুটহাট বানানরীতি বদলালে এবং নিজেদের বইয়েই তা না মানলে কেমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তা সহজেই অনুমেয়। অজস্র সময় ও কোটি কোটি টাকার অপচয় হয়, শব্দের প্রকৃত অর্থ বদলে যেতে থাকে; আর তা যদি হয় ধর্মগ্রন্থীয় শব্দ তবে তো কথাই নেই; স্থানবিশেষে কুরুক্ষেত্র বেঁধে যায়; সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ায়, (কারণ বানানবিধানে আছে তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ অক্ষুণ্ণ থাকবে, এগুলোর দীর্ঘস্বরকে হ্রস্ব করলে অর্থের পরিবর্তন হয় বলে সনাতন ধর্মবেত্তাগণ কড়া আপত্তি তোলেছিলেন। এ ধরনের আপত্তি তো একই কারণে আরবি ফারসির ক্ষেত্রে মুসলিম ধর্মবেত্তাগণও করবেন) সর্বোপরি এ ধরনের ভিত্তিহীন ও অপরিণামদর্শী পরিবর্তনের ফলে ভাষা শ্রীহীন, দুর্বোধ্য ও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। এত বিকল্প শিশুদের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর। তারা একেক বিষয় পড়তে গিয়ে একেক বানান দেখে আরো বিভ্রান্ত হয়। তখন তাদের কাছে ইংরেজিকেই সহজ ভাষা মনে হয়। অথচ বাংলা পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ ও সুপ্রাচীন ভাষা। এর রয়েছে শৃঙ্খলাবদ্ধ সুন্দর বর্ণমালা, অফুরন্ত শব্দভাণ্ডার। তাই মনগড়া বিধান চালু করে শিশুদের মধ্যে মাতৃভাষা-ভীতি তৈরি করা গর্হিত অপরাধ। তাই সংস্কৃতের মত বিদেশি শব্দেরও প্রচলিত বানান অক্ষুণ্ণ রাখার কোনো বিকল্প নেই। যেমন- আওয়ামি নয়, আওয়ামী ই থাকবে; লিগ নয় লীগ থাকবে; সুপ্রিম নয় সুপ্রীম থাকবে; ইদ নয়, ঈদ থাকবে। দেশবাসী ক্ষিপ্ত হওয়ার আগে এরকম সব সঠিক বানান অক্ষুণ্ণ না রেখে উপায় নেই। আধুনিক বাংলা অভিধানে ‘ইদ’ শব্দটির ভুক্তিতে বলা হয়েছে, ” ‘ইদ/ইদ্/[আ.]বি. ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব; (ইদুল ফিতর বা ইদুল আজহা); খুশি, উৎসব; ঈদ-এর সংগততর ও অপ্রচিলত বানান। ইদ মোবারক /ইদ্ মোবারক্/বি. ইদের শুভেচ্ছা বিনিময়কালে উচ্চারিত অভিবাদন।’ অন্যদিকে, অভিধানের ‘ঈদ’ ভুক্তিতে বলা হয়েছে, ‘/ইদ/[আ.]বি. ইদ-এর প্রচলিত ও অসংগত বানান।’ আবার বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে ‘ইদ’ শব্দের ভুক্তিতে নির্দেশ করা হয়েছে ‘ঈদ’।” যাই হোক, তাঁরা বোঝাচ্ছেন, ‘ইদ’ বানানটি সংগত আর ‘ঈদ ‘অসংগত? হায়রে পাণ্ডিত্য! এবার আমরা দেখব বাংলা একাডেমি কতটা সংগত। যদিও ডিজি শামসুজ্জামান খান ইতোমধ্যেই বলে বসেছেন, “এই পরিবর্তনে এত মাতামাতি করার কিছু নেই। আমার মনে হচ্ছে, জামায়াত অথবা কোনও উগ্রবাদী মতাদর্শের লোকজনের বিষয়টি নিয়ে বেশ মাথা ব্যথা শুরু হয়েছে।” রাজনৈতিক নেতাদের মত কথা বললেন; অথচ তার ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে তিনি রাজনীতিক নন; রাষ্ট্রের চাকর হিসেবে তার এ বক্তব্যও অসংগত। এই পরিবর্তনে বাংলা একাডেমির কারো মাতামাতির কিছু নেই- এক্ষেত্রে কথাটি ঠিকই আছে। কারণ যাদের মাথা নেই তাদের ব্যথাও নেই। কোনো বিষয না জানলে মাতামাতির কী বা থাকে বলুন? তবে একাডেমি ‘ঈদ’ এর বদলে ‘ইদ’ লিখে কী অপকর্মটি করেছে তা জানা দরকার । আরবি ‘ঈদ’ ( عيد) এর বাংলা অর্থ- আনন্দ, উৎসব, পর্ব ইত্যাদি । আর ‘ইদ’ (عد) এর বাংলা অর্থ- ব্রণ, ফোঁড়া, বিষফোঁড়া ইত্যাদি। একাডেমির সবাই আরবিতে অজ্ঞ, অথচ আমাদের বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারে বিদেশি শব্দের মধ্যে আরবির সংখ্যাই সর্বাধিক! আর এ ভাষা গবেষণার সুমহান দায়িত্ব যারা পালন করছেন তাদের কেউই আরবি জানেন না। তাইতো তারা আনন্দের বদলে বিষফোঁড়ার জন্ম দেন। ভাষা না জেনেও এর গবেষণা কেবল বাংলাদেশেই সম্ভব- কত হতচ্ছাড়া জাতি আমরা। বহুভাষাবিদ পণ্ডিতদের আসনে কারা বসে আছে! কে নেয় এসব খবর!

ঢাকা, ২৪ জুন ২০১৭১৭

আসিফ নজরুলের মিথ্যাপাঠ

shams-rasheed-joy শামস রাশীদ জয়

কাগজের বাঁশেরকেল্লা প্রথম আলো গতকাল একটা লেখা ছাপিয়েছে সুশীল ও ‘নদী আইন’ বিশেষজ্ঞ আসিফ নজরুলের। শিরোনামঃ ‘ব্যতিক্রমী সেক্টর কমান্ডার’। বিষয় মেজর জিয়া। মিথ্যা তথ্য বাজারে চালু করানোর একটা বহুলচর্চিত পন্থা হচ্ছে মিথ্যা তথ্যগুলোর সাথে অধিক সংখ্যক সত্য মিশিয়ে। এই লেখাটা সেরকম। মিথ্যাচারে বোঝাই হলেও ব্যতিক্রমী ভাবে বেশ কিছু সত্য মেশানো। কিছু উদাহরণ দেই-

১: চট্টগ্রাম বন্দরে অস্ত্র খালাসের সাথে মেজর জিয়া জড়িত ছিল, এটা স্বীকার করা হয়েছে। তবে তিনি যে বেশ কিছুদিন ধরেই সেই খালাসের সাথে জড়িত এবং খালাস প্রক্রিয়ার গতি ধীর করার কোনো চেষ্টাই করেন নি, সেটার উল্লেখ নেই বরং অর্ধসত্যটার উপস্থাপনা এমনভাবে করা হয়েছে যেন তিনি অস্ত্র খালাস কাজে যাওয়ার সময়ই বিদ্রোহ করেছেন এবং কখনই অস্ত্র খালাস করেন নি। মানে, গণহত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র দেশের মাটিতে আনার কাজের কোনো নৈতিক দায় যেন মেজর জিয়ার নেই।

২: বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণে উদ্দীপ্ত সৈনিক হিসেবেই মেজর জিয়া বিদ্রোহ করেছিলেন – এটা স্বীকার করা। কি তাজ্জব! #হেজাবি (হেফাজত+জামাত+বিএনপি) পন্থী সুশীলের মুখে একি শুনি! বঙ্গবন্ধুকে ‘বঙ্গবন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করা এবং তাঁর ৭ই মার্চেsheikh-mujibর ভাষণটিকে সৈনিকদের মূল প্রেরণা হিসেবে স্বীকার করা! এসবই আসিফ নজরুল করেছেন একটা উদ্দেশ্যে – স্বাধীনতা ঘোষণার পাঠককে স্বাধীনতার ঘোষক বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টায়।

৩: মেজর জিয়াকে ১১ জন সেক্টর কমান্ডারের একজন হিসেবে উল্লেখ করা। অর্থাৎ হেজাবি সুশীলেরা প্রায়ই যে মেজর জিয়াকে মুখ্য সেক্টর কমান্ডার আর বাকিদের নিম্ন বর্গীয় সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দেখাতে চায়, সেটা থেকে আসিফ নজরুল একটু সরে এসেছেন। এই সরে আসাটা শুধু মেজর জিয়াকে ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টায়।

এখানেও আসিফ সাহেব আরেকটা মিথ্যাচার করেছেন। সেক্টর কমান্ডার ১১জন ছিলেন না। ছিলেন ১৫ জনের অধিক। কারণ, যুদ্ধ চলাকালীন কিছু পদে বদলী হয়েছিল। অন্য কেউ এই ভ্রান্তি করলে সেটাকে ভুল হিসেবে নিতাম। কিন্তু এটা তো স্বয়ং আসিফ নজরুল। মুক্তিযুদ্ধের স্বঘোষিত গবেষক আসিফ নজরুল। গণআদালতের দলিল সংকলক আসিফ নজরুল। উনার এই বেঠিক তথ্যটিকে তাই ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচার হিসেবেই নিতে হচ্ছে।

৪: তারিখের ব্যপারে আসিফ সাহেব কিঞ্চিত সত্য কথা লিখেছেন। ২৭শে মার্চে ঘোষণা পাঠের কথা বলেছেন। হেজাবিদের ২৬ তারিখ নিয়ে মিথ্যাচার থেকে এটা কিছুটা সরে আসা। ‘কিছুটা’ এই কারণে যে, উনি লেখার শুরুতে বলেছেন ২৫শে মার্চ রাতে বিদ্রোহ করার কয়েক ঘন্টা পরেই তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করা শুরু করেন, মানে, ইঙ্গিতে বলে দেয়া ২৬শে মার্চের কথা। হয়তো হেজাবি কমান্ড থেকে পুরোপুরি ২৭ তারিখের ন্যারেটিsector-commandersভে সরে আসার অনুমতি মিলে নাই তাই।

যাই হোক মেজর জিয়ার নিজের ভিডিও ইন্টার্ভিউতে ২৭শে মার্চে কালুরঘাটে যাওয়ার কথা আছে।

লিঙ্ক: https://web.facebook.com/shams.rasheed/videos/vb.548808052/10151201648423053

হয়তো আসিফ সাহেব মেজর জিয়াকে বেগম জিয়া থেকে বেশী ঘনিষ্ঠভাবে চেনেন, সেই হক আদায় করতে গিয়েই এই আজগুবি দাবীটার জন্য দুপয়সা ফু দিয়ে রাখলেন। ব্যতিক্রম বটে!

৫: মেজর জিয়া কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ‘মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ এর পক্ষে ঘোষণা পাঠ করেন – এই সত্যটা স্বীকার করেছেন আসিফ নজরুল। তবে এখানেও হেজাবি চুলকানি দিয়ে রেখেছেন, পাঠককে ঘোষক বলার চেষ্টা করেছেন।

৬: ‘মেজর জিয়া অন্যান্য সেক্টর কমান্ডার আবু তাহের, এম এ জলিল বা খালেদ মোশাররফের মতো সম্মুখযুদ্ধের অসীম সাহসী যোদ্ধা ছিলেন না’ – এই কথা লিখেছেন আসিফ নজরুল। শুধু এই কথাটির জন্যই ‘নদী আইন’ বিশেষজ্ঞ আসিফ নজরুলকে এই লেখায় যথেষ্ট সম্মানের সাথে সম্বোধন করছি। তবে এই কথাটির জন্য হেজাবি চাকরিটা হারাতে পারেন তিনি। কেউ তাকে উদ্দেশ্য করে বলে ফেলতে পারে- ‘চুপ বেয়াদ্দব, আসিফের নামই পাল্টে ওয়াসিফ করে দেব’।

যাই হোক, হেজাবি সুশীলের কাছ থেকে আসা এই স্বীকারোক্তি আসলেই একটি ব্যতিক্রম।

আলোচনা? উকিল আসিফ নজরুল একি বললেন, আলোচনা? বিতর্কও না! মানে, পক্ষ-বিপক্ষ আছে, কোন কিছুই নিষ্পন্ন না! কত বড় স্পর্ধা উকিল সাহেবের। উনি আইনের ছাত্র, আইনের শিক্ষক। নিশ্চয়ই উনি জানেন যে, দেশে সুপ্রিমকোর্টের রায় মানেই নিষ্পন্ন হওয়া বিষয়।

আলোচনা? উকিল আসিফ নজরুল একি বললেন, আলোচনা? বিতর্কও না! মানে, পক্ষ-বিপক্ষ আছে, কোন কিছুই নিষ্পন্ন না! কত বড় স্পর্ধা উকিল সাহেবের। উনি আইনের ছাত্র, আইনের শিক্ষক। নিশ্চয়ই উনি জানেন যে, দেশে সুপ্রিমকোর্টের রায় মানেই নিষ্পন্ন হওয়া বিষয়।

৭: আসিফ আরেকজায়গায় বলেছেন, ‘শমসের মবিন চৌধুরী ও হাফিজ উদ্দিনের ন্যায় তাঁর নিজস্ব কমান্ডের অফিসারদের মতো মেজর জিয়া যুদ্ধ করতে গিয়ে আহতও হন নি’। আউচ!!! জিয়া ভীতু? তাও আবার বয়ানে হেজাব অধ্যাপক! আসলেই ব্যতিক্রম।

তবে এই ব্যতিক্রমটাও আসলে মেজর জিয়াকে ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টাতেই করেছেন আসিফ সাহেব। হয়তো বলেছেন, ‘ম্যাডাম, কিছু জায়গায় ডিসকাউন্ট দেই, মূল কাজটা করিয়ে নিচ্ছি, আমি আসিফ কসম কেটে বলছি, স্যারকে ঘোষকের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেই ছাড়বো, এনশাল্লা’। আসিফ সাহেব ঘোষক প্রতিষ্ঠায় কিছু যুক্তি দিয়েছেন, সেগুলো নিয়ে এই লেখার পরের দিকে বলবো, ধৈর্য রাখুন পাঠক।

৮: হেজাবি সেলিব্রেটি সুশীল আসিফ নজরুল এরপর বলেছেন ‘২৫শে মার্চ কাল রাতের পর জিয়ার আগেই চটগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতা এম এ হান্নান বেতারে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন’। এই বাক্যটি পড়ে মনে হলো বলি – ‘আমারে কেউ ধর’ বা ‘আমারে কেউ মাইরা লা’।

এ তো দেখছি পুরো ৫২ তাস বাজি রেখেছেন আসিফ নজরুল, এত এত ডিসকাউন্ট, শুধুমাত্র মেজর জিয়াকে ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টায়। আসিফ সাহেবের গলায় গোলাপী শিফনের দড়িভাগ্য আছে, থুক্কু, আসিফ সাহেবের কপালে খারাবী আছে। আসল কাজটা করতে না পারলে ম্যাডামের রোষানল থেকে আসিফ সাহেবকে কে বাঁচাবে?

খুব সম্ভবত এই প্রথম কোনো হেজাবি মুখপাত্র এম এ হান্নানের ঘোষণা পাঠের কথা স্বীকার করলেন। তবে এখানেও চুলকানি আছে কারণ এই তথ্যটা দেয়ার আগে উনি ভাসানীকে আরও অনেক আগে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার ক্রেডিট দেয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। সেই ভাসানী যিনি ৭০ সালের নির্বাচন ভন্ডুল করার চেষ্টা করেছিলেন। যেই নির্বাচনের ফলাফলই ছিল আমাদের স্বাধীনতার জন্য জনগণের দেয়া ম্যান্ডেট। আর, পুরো আইয়ুব আমলে ভাসানীর আপোষ আর পিছে ছুরি মারার কথাগুলো আর নাই বা বললাম।

৯: স্বাধীনতার ঘোষণার নবম পাঠক সম্পর্কে আসিফ নজরুল বলেছেন, ‘জিয়ার ঘোষণাটির অতুলনীয় প্রভাব পড়ে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে এটি দেয়া হয়েছিল বলে’। হেজাবিদের বহুল অস্বীকৃত এই সত্যটি স্বীকার করতে গিয়ে আসিফ নজরল যথারীতি একটি ল্যাঞ্জা রেখেছেন, মাইদুল সাহেবের বইয়ের রেফারেন্সে – ‘মেজর জিয়া তাঁর প্রথম বেতার বক্তৃতায় (২৭শে মার্চ সন্ধ্যা) নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করলেও পরদিন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের পরামর্শক্রমে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা প্রকাশ করেন’।

ঘোষককে একই সাথে রাষ্ট্রপ্রধানও বানানোর এই রেফারেন্স ব্যবহার করতে গিয়ে আসিফ সাহেব সময়ের তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন। এই রেফারেন্স অনুসারে মেজর জিয়ার প্রথম বেতার সম্প্রচারটিই হয় ২৭শে মার্চ সন্ধ্যায়। মানে আসিফ সাহেব নিজেই নিজের এই লেখার অন্য জায়গায় ২৬শে মার্চ প্রত্যুষের বেতার বক্তৃতার দাবীকে বিরোধিতা করে ফেলেছেন।

এত এত ব্যতিক্রমের ভিড়ে আসিফ সাহেব কয়েকটি ব্যতিক্রম উল্লেখ করতে ভুলে গেছেন। যেমনঃ

১: মেজর জিয়াউর রহমানই একমাত্র সেক্টর কমান্ডার যিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বরখাস্ত হয়েছিলেন প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানী দ্বারা (বরখাস্তের আদেশটি বাতিল করে দেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ)। বরখাস্তের কারণ ছিল নিজের নামে ব্রিগেডের নাম রাখার অপরাধ। তাজউদ্দীন আহমেদ বিষয়টি মিটমাট করে জিয়াকে রক্ষা করার জন্য শফিউল্লাহ ও খালেদ মোশাররফের নামের ব্রিগেডের নাম রাখা নির্দেশ দেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, তাজউদ্দীন সাহেবকে এর চার বছরের মাথায় প্রাণ দিতে হয় জিয়া গং এর হাতেই।

২: জিয়াকে ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে আসিফ নজরুল যেই এ কে খোন্দকারের রেফারেন্স দিয়েছেন সেই এ কে খন্দকারই একমাত্র সেক্টর কমান্ডার যিনি সেক্টর কমান্ডার ছিলেন না।a-k-khondokar-shofiullah

৩: জিয়াকে ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে আসিফ নজরুল যেই এ কে খোন্দকারের রেফারেন্স দিয়েছেন সেই এ কে খন্দকারই একমাত্র সিনিয়র অফিসার যিনি বিমান বাহিনীর লোক হয়েও সেনাবাহিনীর পোস্টিং পেয়েছিলেন। সেনা প্রধান কর্নেল রব এর অধীনে উপ সেনাপ্রধান ছিলেন এ কে খোন্দকার।

৪: জিয়াকে ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে আসিফ নজরুল যেই এ কে খোন্দকারের রেফারেন্স দিয়েছেন সেই এ কে খন্দকারই একমাত্র সিনিয়র অফিসার যিনি মার্চ মাসেও বিদ্রোহ করেন নি। এপ্রিলেও বিদ্রোহ করেন নি। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। সিনিয়র ও বিলম্বে আসা অফিসার হওয়ায় তাঁকে প্রবাসী সরকার উপসেনাপ্রধান নামের একটি গুরুত্বহীন পদে বসায়।

৫: গণহত্যার দুটি প্রধান লজিস্টিক্স হলো সৈন্য ও অস্ত্র।

সৈন্য এসেছিল ঢাকা বিমানবন্দর দিয়ে। সেই প্রজেক্টের ডিউটি এ কে খোন্দকার করেছেন মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত।

অস্ত্র এসেছিল চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর দিয়ে। সেই প্রজেক্টের ডিউটি মেজর জিয়া করেছেন ২৫শে মার্চ বা মতান্তরে ২৬শে মার্চ পর্যন্ত।

এই জায়গায় জিয়া ও খোন্দকার উভয়েই ব্যতিক্রম বাকি সকল সিনিয়র অফিসারদের থেকে। আর আজ ‘নদী আইন’ বিশেষজ্ঞ আসিফ নজরুল জিয়ার জন্য সাক্ষী মানছেন খোন্দকারকে। এটা #পাপিচুস সিন্ড্রোম। যাদের জানা নেই তাদের জন্য উল্লেখ করছি, পাপিচুস = পারষ্পরিক পিঠ চুলকানো সমিতি।

৬: এই দেশে অনেক ধরণের সুশীল আছে। হেজাবি সুশীল আছে অনেকে। কিন্তু একটি জায়গায় স্বয়ং আসিফ নজরুল ব্যতিক্রম। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম সকল হেজাবি সুশীলের চক্ষুশূল হয়ে উঠলেও, জাহানারা ইমামকে পুনরায় ক্যান্সার আক্রান্ত করার মাধ্যমে হত্যা করার অপকীর্তি আছে কেবল আসিফ নজরুলের দ্বারা।

লিঙ্ক: https://web.facebook.com/shams.rasheed/posts/10153644025883053 এই ব্যতিক্রমটা অবশ্যই ব্যতিক্রম বিষয়ক লেখায় থাকা উচিৎ ছিল। লেখক না লিখে থাকলে পত্রিকার ক্রেডিট লাইনে লিখে দেয়া উচিৎ ছিল।

৭: যুদ্ধের ময়দানে নিজের লোগো ডিজাইন করে সেটা দিয়ে নিজের বাহিনীর লেটারহেড প্যাড তৈরি করে সাহেবী কায়দার কমান্ডার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তো বটেই, পৃথিবীর যুদ্ধের ইতিহাসে আর আছে কিনা জানি না। এটাও একটা ব্যতিক্রম। অথচ এটার উল্লেখ নেই আসিফ নজরুলের লেখায়। লিঙ্ক: https://web.facebook.com/photo.php?fbid=10152364168563053

৮: আসিফ নজরুল আরও রেফারেন্স দিয়েছেন গোলাম মুরশিদের বইয়ের। বিতর্কিত সেই বইও প্রকাশ করেছে প্রথম আলোর প্রকাশনী যেই প্রথম আলো আসিফ নজরুলের এই নিবন্ধেরও প্রকাশক। আসিফ নজরুলের লেখার সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে ১৯৯১ বা ৯২ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ‘নিষিদ্ধ মিছিলে’ পড়ে। তখন ওপেন সিক্রেট ছিল যে, উপন্যাসটির মূল চরিত্রটি আসলে ছিল তখনকার তুমুল কুখ্যাত ও আসিফ নজরুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু গোলাম ফারুক অভি। অভির কুখ্যাতির মূল কারণটি ড. মিলনের হত্যাকান্ড, ২৭শে নভেম্বর ১৯৯০। সেই অভির আপন বড় ভাই হচ্ছে গোলাম মুরশিদ।

ব্যাপারটা মাল্টি লেভেল পাপিচুস। ব্যতিক্রমী এই বিষয়টা এই প্রবন্ধের প্রাণশক্তি। সেটার কোনো ডিসক্লেইমার লেখাটিতে দেয়া নেই।

ঘোষক জিয়ার জন্য আসিফ নজরুলের যুক্তি সমগ্র। আসিফ নজরুল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যেটা বলতে চেয়েছেন যে, আরও আটজন স্বাধীনতার ঘোষণা ‘পাঠ’ করলেও মেজর জিয়ার ঘোষণাটিই মূলত দেশবাসী ও বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের আশ্বস্ত করে যে, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে, এবং এতে তাঁদের মনোবল দৃঢ় হয়, তাঁরা অনুপ্রাণিত হন ও উদ্দীপ্ত হন। এর কারণ হিসেবে দুটি যুক্তি দিয়েছেন। এই নয়জনের মধ্যে কেবল মেজর জিয়াই মিলিটারি অফিসার এবং এম এ হান্নানের বক্তৃতাটি যেহেতু শক্তিশালী ট্রান্সমিটারে প্রচারিত হয় নি।

এই যুক্তির গভীরতা প্রমাণে তিনি রেফারেন্স দিয়েছেন যেসব বই বা লেখার, সেগুলোর সবই প্রকাশিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পরে বা অনেক পরে। তিনি রেফারেন্স দেন নি ২৬শে মার্চের। যেদিন আমেরিকার কমপক্ষে দুই দুইটি টিভি নেটওয়ার্ক এর নিউজে শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার ও মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সংবাদ প্রচারিত হয়েছিল বাংলাদেশ সময় ২৭শে মার্চ ভোর চারটার দিকে। সেগুলোর ভিডিও ফুটেজ আছে, টাইম স্ট্যাম্প সহ।

লিঙ্কঃ-১ সিবিএস নিউজ ২৬শে মার্চ https://web.facebook.com/shams.rasheed/videos/vb.548808052/10152253549503053

২ : এবিসি নিউজ ২৬শে মার্চ https://web.facebook.com/shams.rasheed/videos/vb.548808052/10152315647798053

৩: এনবিসি নিউজ ২৯শে মার্চ https://web.facebook.com/shams.rasheed/videos/vb.548808052/10152244855273053

উপরের তৃতীয় লিঙ্কটি ২৯শে মার্চের ফুটেজ। অর্থাৎ মেজর জিয়ার রেডিও বার্তার দুই দিন পরেও নিউজ ছিল শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণার। মেজর জিয়ার উদ্দীপনা আর অনুপ্রেরণা ফুটেজে খুঁজে পাওয়া যায় না।

ভোর চারটা মানে মেজর জিয়ার বেতার বক্তৃতার ১৪ ঘন্টা বা তারও আগে। নিক্সন-কিসিঞ্জারের আমেরিকা তখন ছিল সরাসরি শত্রুপক্ষ, পাকিস্তান মিলিটারিকে অস্ত্র, খাদ্য, ও অর্থ সাহায্য দেয়া মোড়ল। সেখানেই বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার সংবাদ এসেছে, তাহলে নিশ্চয়ই বিশ্বের অন্যান্য দেশের টিভি ও রেডিও বিশেষ করে শর্টওয়েভ রেডিওতেও এসেছিল।

সেই সময় প্রায় সকল গৃহস্থের বাসায় রুটিন করে শর্টওয়েভ ব্যান্ডে বিবিসি থেকে শুরু করে বিদেশী বিভিন্ন রেডিও স্টেশনের খবর শোনা প্রচলন ছিল। মেজর জিয়া বক্তৃতা করার অনেক ঘন্টা আগেই পৃথিবী জানে, গ্রামবাংলা জানে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের স্বাধীনতা ঘোষণার কথা।

আমি মেজর জিয়াকে খাটো করার চেষ্টা করছি না। আগেও করিনি। আজও করছি না, ভবিষতেও করবো না। আমি লেখার সময় সুনির্দিষ্টভাবে মেজর জিয়া আর জেনারেল জিয়ার মধ্যে বিভাজন আনি। আমার যত সমালোচনা তা জেনারেল জিয়াকে নিয়ে, মেজর জিয়াকে নিয়ে না। কিন্তু মেজর জিয়াকে যখন হুদাই বাড়তি গ্লোরিফাই করার চেষ্টা করে বেগমের চামচারা তখন আলোচনা করতে হয়। আসলে মেজর জিয়াকে খাটো করে বেগমের চামচারাই। কি জানি, হয়তো বেগম ইচ্ছা করেই এই কাজটা করেন। অনেক রাগ তো উনার মেজর জিয়ার উপর।

আসিফ নজরুল স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে সত্যমিথ্যা মিশিয়ে এত কথা লিখলেন, ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ‘স্বাধীনতার ডাক’ এর কথা পর্যন্ত উল্লেখ করলেন, কিন্তু তিনি বঙ্গবন্ধুর ২৬শে মার্চের প্রথম ঘন্টায় দেয়া স্বাধীনতার ঘোষণাটির কথা উল্লেখ করলেন না। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ হয় নি নিজেই রেডিও স্টেশনে গিয়ে ভাষণটি দেয়ার। বা আগে রেকর্ড করে রাখাটিও যথার্থ হতো না। তার মানে এই না যে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন নি।sheikh-mujib-2

পৃথিবীর ইতিহাসে স্বাধীনত ঘোষণার যোক্তিক অবস্থানে এসে তারপর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ ও প্রচার করে তারপর মুক্তিযুদ্ধ করে তারপর সেই যুদ্ধে দখলদার মিলিটারিকে পরাজিত করে স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্লাসিক পন্থায় রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু করতে পেরেছে মাত্র দুটি দেশঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তথা যুদ্ধকালীন সংবিধান গ্রহণ ও প্রচার করা হয় ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল। এই ঘোষণাপত্রের উপর ভিত্তি করেই রচিত হয় মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধ। এই ঘোষণাপত্রে সুস্পষ্টভাবে ঢাকায় ২৬শে মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দ্বারা স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার কথা উল্লিখিত ছিল প্রথমেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় সেই ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক করার কুরুচি হয় নি কারো আর আজ এত বছর পর উদির ভাই আসিফ আর প্রথম বাঁশেরকেল্লার আলো সেই বিতর্ক করছে।

মরি হায় হায় রে! লিঙ্কঃ-১ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের টেক্সট : https://web.facebook.com/notes/shams-rasheed-joy/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A7%E0%A7%80%E0%A6%A8%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%98%E0%A7%8B%E0%A6%B7%E0%A6%A3%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0/10151899097923053

২: স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রকাশ করার পর তাজউদ্দীন সাহেবের ভাষণ ঋণের টেক্সট : https://web.facebook.com/notes/shams-rasheed-joy/tajuddin-statement-april-17-1971-to-the-people-of-the-world/10151899128433053

এবং

৩: স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রকাশ করার কিছু ভিডিও ফুটেজ: https://web.facebook.com/…/v…/vb.548808052/10151358890253053

লেখার শেষে জেনারেল জিয়ার ইস্যুটাকে কিছুটা আলাদা করতে গিয়ে আসিফ নজরুল সাহেব লিখেছেন, ‘স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে শুধু জিয়া নন, আরও অনেকের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে নানা আলোচনা রয়েছে। কিন্তু সেটি তাঁদের একাত্তরের ভূমিকাকে ম্লান করতে পারে না।’

লিঙ্ক: http://www.prothom-alo.com/special-suppleme…/article/1040569

আলোচনা? উকিল আসিফ নজরুল একি বললেন, আলোচনা? বিতর্কও না! মানে, পক্ষ-বিপক্ষ আছে, কোন কিছুই নিষ্পন্ন না! কত বড় স্পর্ধা উকিল সাহেবের। উনি আইনের ছাত্র, আইনের শিক্ষক। নিশ্চয়ই উনি জানেন যে, দেশে সুপ্রিমকোর্টের রায় মানেই নিষ্পন্ন হওয়া বিষয়। জিয়াউর রহমান সম্পর্কে সুপ্রিমকোর্টের সুস্পষ্ট রায় আছে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক। মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষক নন। জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক বলা বেআইনি। জেনারেল জিয়াকে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের খুনি বলা যাবে না। তিনি ছিলেন ষড়যন্ত্রকারী।

এগুলো নিষ্পন্ন হওয়া বিষয়, জনাব আসিফ নজরুল। আইনের লোক হিসেবে আসিফ নজরুলের অন্তত আইনের বিষয়টি খেয়াল রাখা উচিৎ ছিল। যাই হোক, আশা করি সুপ্রিমকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আসিফ নজরুলের এসব আইনবিরুদ্ধ ও আদালত অবমাননাকর বক্তব্যের ব্যাপারে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেবেন।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে আইন চাই।

বাই দ্য ওয়ে, আসিফ নজরুল আরেকটা নতুন সর্বৈব মিথ্যা বাজারে এনেছেন, জিয়াই নাকি বিদ্রোহ করা প্রথম সিনিয়র অফিসার! আমি গবেষক নই, তবে, আমারই অন্তত দুজন সিনিয়র অফিসারের নাম মনে পড়ছে যারা জিয়ারও আগে বিদ্রোহ করেছিলেন, মেজর শফিউল্লাহ ও মেজর মাসুদ খান।

লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশনে অধ্যয়নরত

মেঘের সাথে আড়ি (বাংলাদেশ বিমানে ভ্রমণের সময়)

মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া

kib-prof

শিরোনামটি একটি বাংলা টেলিফিল্মের।
টেলিফিল্মের প্রসঙ্গে পরে আসি।
সেপ্টেম্বরের আঠারো তারিখ দেশে যাচ্ছি, এটা অনেক আগেই নির্ধারণ করা ছিলো। প্রায় মাসখানেকের প্রস্তুতি। যাচ্ছি প্রায় পাঁচ বছর পর। অনেকেরই নানান আব্দার। আব্দার মেটানোর চেষ্টায় দিনকে রাত আর রাতকে তিন বানিয়ে চলছে উন্মত্ত প্রস্তুতি।
আকাশে শান্তির নীড় (বিমান) এর যাত্রী হয়েছি। সরাসরি হিথ্রো টু ঢাকা ভায়া সিলেট। অর্থ্যাৎ, প্রথমেই আকাশের সাদা বলাকা সিলেট এম এ জি উসমানী-তে অবতরণ করবে। ষোল তারিখের জনমত প্রকাশিত হবার প্রচেষ্টায় শামিল ছিলাম। কিন্তু সেদিন একটু আগেভাগেই অফিস ত্যাগ করি। তুমুল বৃষ্টিতে বেরুবার আগে সাঈম চৌধুরীর ছাতাটি চেয়ে বিমুখ হলাম। কিনু ভাইর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, নাজমুল, অপু আর মুবিনের কাছ থেকে অন্তত: পাঁচবার বিদায় নিলাম। বেরুলাম বৃষ্টি মাথায় নিয়ে, ইচ্চেছ অসবর্ন স্ট্রিট থেকে ২৫ নম্বরে হোয়াইটচ্যাপেল, তারপর ট্রেন। ভিজতে ভিজতে কিছু দূর যাবার পরই অভ্যেস বশত: পকেটে হাত দিয়ে দেখি মোবাইল নেই। ফের জনমতে।
মোবাইল চেয়ারে পড়েছিলো। এই সুযোগে আবারো বিদায় নিলাম।
আবারো বৃষ্টিতে ভেজা। এত তাড়া ছিলো যে আর কোন দিকেই তাকাইনি। আসলে সেদিন ছিলো ক্যাব স্ট্রাইক।
অসবর্ন রোড থেকে ২৫ নম্বরে উঠবো। মোবইলের এ্যাপসে বাস টাইম চেক করে দেখি ৪ মিনিট বাকি। ভাবলাম বৃষ্টিতে ভেজার চেয়ে অপেক্ষাই ভালো। বাস আসলো ৬ মিনিট পর। আসলে একটি যথাসময়ের সাক্ষাতের তাড়নায় আর কোনও দিকে তাকানোর দায় ছিলো না। আর ছিলো না বলেই কঠিন ধরা খেলাম। শেষ পর্যন্ত ইস্ট লন্ডন মস্ক বাস স্টপেই নামলাম। নেমেই বৃষ্টিতে ভিজে-দৌড়। দৌড়াতে দৌড়াতে কাকভেজা হয়ে ট্রেন ধরলাম।
পরের দিন বৃহস্পতিবার। কিন্তু, আমি এটা সেটা গোছাতে গোছাতেই সময় পার। সোয়া চারটায় কাজে গেলাম। কিন্তু কোনভাবেই মন বসাতে পারলাম না। জাকারিয়া আর আলস্টনকে ম্যানেজ করে গেলাম ম্যানেজারের কাছে। আগেই বেরিয়ে পড়লাম।
বেরুতে না বেরুতেই কবিরের ফোন। সকাল দশটা থেকে এগারোটার ভেতরে স্ট্র্যাটফোর্ড যেতে হবে। সাথে জাভেদ, খালেদ ও আরো দুজন। তড়িঘড়ি শুতে গেলাম। শুতে না শুতেই দুঃস্বপ্ন। স্বপ্নে এসে ইয়া বড় এক খরগোস কামড়ে গেলো। ঘুম ভাঙ্গার পর জোড় করে আবারো ঘুমাতে চেষ্টা করলাম। খুব একটা ভালো ঘুম হলো না। ঘুম ভাঙ্গলো সাতটায়। প্রথমেই মনে হলো, সন্ধ্যা সাড়ে আটটায় -আকাশে শান্তির নীড়। তারপর মনে হলো কবিরের সাথে এপয়েন্টমেন্টের কথা। মনে পড়লো অপুর কাছ থেকে ল্যাপটপ সংগ্রহ করতে হবে। নাস্তা সাড়তে না সাড়তেই সোয়া নয়টা। এমন সময় আমাদের বাংলার জাকির ভাইর ফোন। তার অপেক্ষায় পনের মিনিট কাটলো। বেরুলাম। একশো চারে করে স্ট্র্যাটফোর্ড। কবিরের সাথে শ্রেফ পনের মিনিটের সাক্ষাতকারটি শেষ পর্যন্ত দুই ঘন্টায় গড়ায়। এর ভিতরে সারে বারোটায় অপুর ফোন। ট্যাক্সট করে বললাম, বিশ মিনিট। অপুর উত্তর, ওহ মাই গড, হোয়াট উইল আই ডু দিস টোয়েন্টি মিনিটস।
সাক্ষাৎকারের ফাঁকেই তাকে জানালাম, ভাই আমার, প্লিজ।
শেষ পর্যন্ত সে ঠাণ্ডা হলো।

একটায় বেরিয়ে অপুকে ফোন দিলাম। এমন সময় বৃষ্টি, বৃষ্টি আর বৃষ্টি। একদম গোটস এন্ড কাউ রেইন। কাউন্সিল অফিসের কৃপন আড়ালে একটুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। হাতে সিগারেট ছিলো। বৃষ্টিতে ভিজে একদম সাড়া।
অপুর কাছ থেকে ল্যাপটপ নিয়েই দৌড়। একশ চারের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে শেষ পর্যন্ত অন্য বাসে প্লাস্টো, পরে ট্রেনে ইস্টহ্যাম। বৃষ্টি কিন্তু ঝড়ছে। সাথে পাসপোর্ট, সকল সার্টিফিকেট, জরুরি কাগজপত্র এবং অফিসের ল্যাপটপ। একটু দ্বিধায় ছিলাম। ভিজে সব বরবাদ হয় কি না আবার। শেষ পর্যন্ত ঘরে ফিরলাম আড়াইটায়। সাড়ে তিনটায় বেরুবো। রেডি হবার ফাঁকে হঠাৎ মনে পড়লো আগের দিন দীনেশ বলছিলো, এখন হজ্বের সময়। ফ্লাইট ঠিকমতো হয়, নাকি দুদিন হিথ্রোতে থাকতে হয় কে জানে! সে আসলে বাংলাদেশ বিমানের দুর্নামের কথা শুনে মন্তব্য করছিলো।
আমি সহসাই একটু চিন্তিত হলাম। সত্যিইতো, হজ্বের সময়। ফ্লাইট যদি সময়মতো না হয়!
বেরুলাম। আকাশ কাঁদছিলো। আমার মনটাও ভেজা। আবার চুপিসারে কিছুটা রোদেলা সুখও অনুভব করছিলাম। কারণ, এখনো ভাবি, বাংলাদেশই আমার দেশ। ভবিষ্যতের কথা জানি না। অনেককেই তো বাংলাদেশে না গিয়ে টার্কি, মরিশাস, আরব, ফ্রান্স ইত্যাদি দেশে হলিডে বানাতে দেখি।
ত্রিশ কেজিটাকে টেনেটুনে গাড়িতে ওঠালাম। জানালায় বাই বাই শব্দের রসায়ন চোখদুটো ভিজিয়ে দিচ্ছিলো।
এমন সময় হঠাৎ বৃষ্টি ধরে এলো। মেঘের আড়ালে লুকানো সূর্যটা লাজুক বধুর মতো গোমটা মাথায় দেখা দিলো। কড়া না হলেও রোদের উত্তাপটুকু সহসাই মনে করিয়ে দিলো, আজ হয়তো আকাশে শান্তির কোন সমস্যা হবে না। যেতে যেতে আফগানির সাথে বিশ্ব রাজনীতির (এখনতো সিরিয়া ছাড়া আর কোন কথাই নেই) মাথ চিবালাম। প্রচণ্ড ট্রাফিক ছিলো। শেষ পর্যন্ত ৬টার সময় হিথ্রোতে পৌছূলাম। চেক ইন করিয়ে খাবারের সন্ধানে দৌড়ালাম। একটা কিছু পেটে দিতে হবে। ক্ষিধায় প্রাণ ওষ্ঠাগত প্রায়। খেয়ে দেয়ে সিকিউরিটি চেকের জন্য গেলাম। দ্রুতই হলো। তারপর বাইশ নম্বর গেট।
এখানেই শুরু মেঘের সাথে আড়ি।
দোলাচলে দোলতে দোলতে বোর্ডিং পাস নিলাম। বাংলাদেশ বিমানের চেক ইন থেকে নিয়ে বোর্ডিং পাস পর্যন্ত একজনকে খুব বাংলা, হিন্দি, উর্দূ, ইংরেজি ইত্যাদিতে খুব তড়পাতে দেখলাম। মনে হচ্ছিলো, বাংলাদেশের পুলিশ, যারা বকা না দিয়ে কথা কহেনা। তাঁকে পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত বলাকার পেটে ঠাঁই নিলাম। সংশয়ে দুলতে দুলতেই আসন নিলাম। কয়েক মিনিটরে মধ্যেই হঠাত মনে হলো, আরে, এ যে দেখছি একান্তই নিজেদের পরিবেশ। সবাই কেমন হাসিখুশি, আন্তরিক; মনে হচ্ছিলো সকলকেই বুঝি চিনি। সবগুলো চেহারাই মনে হচ্ছিলো পুরাতন, অর্থাৎ, আগে কোথাও না কোথাও দেখেছি।
আমার মনে হলো, আমি যেন খুব ভালো একটি সময় কাটাতে যাচ্ছি। আসলে ভয়ের কোন উপলক্ষে যখন কোন ভয় থাকে না, বরং আনন্দ থাকে তখন মানুষের মনে যে এক ধরনের উৎফুল্লতা দেখা দেয়- আমি সেই ধরনের আনন্দ-বিহ্বলতায় ভাসছিলাম।
বৃষ্টির শেষে রোদের আগমন, সময়মতো পৌঁছা- ইত্যাদির পর বলাকার পালক আছে কি না, আকাশে সত্যিই শান্তির নীড় পাওয়া যাবে কি না, একটু আরাম করে বসা যাবে কি না ইত্যাদি ছোটখাটো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আর ভাবতে ইচ্ছে করছিলো না। মনে হচ্ছিলো, বসতে পেরেছি, সে-ই যথেষ্ট। কোন রকম ১০টি ঘন্টা না হয় কাটিয়ে দেয়া যাবে। সামনে পেছনে, ডানে বামে কেবলি পরিচিত শব্দ, চেনা ভাষার সুর, চেনা অনুভূতি- এমনকি চেনা কষ্টগুলোও ভীড় করছিলো।
ভ্রমণের সময় বাংলাদেশ বিমানের সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়। খাবারের মান, আসনের অবস্থা, এমন কি- যারা কাজ করছেন তারাও কেমন যেন যান্ত্রিক। খুব বেশি মাত্রায় একঘেয়ে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা এন্টারটেইনমেন্ট এর। সারাটা পথ পুরাতন যুগের রঙিন টেলিভিশনে একটিমাত্র টেলিফিল্ম  ঘুরেফিরে চলেছে।
টনি ডায়েস, তিশা আর নীরবের অভিনীত মেঘের সাথে আড়ি। হয়তো অটো পাইলটের মতো অটো ফিল্ম চালানোর কোনও সুবিধা রয়েছে। তাই, শেষ হবার পর আবারো সেই একই ফিল্ম চালু হচ্ছে।
তবে কাউকেই মনোযোগ দিয়ে টিভির স্ক্রিনের দিকে তাকাতে দেখলাম না। আসলে পরিবেশটার মধ্যে এমন এক আন্তরিকতা ছিলো যে কেউ কোন অভিযোগ করার মতো তুচ্ছতায় যেতে চান নি। হয়তো এ কারণেই লন্ডন-সিলেট ফ্লাইট নিয়ে যুক্তরাজ্য প্রবাসীদের এত আবদার। দীর্ঘ পথের যাত্রায় একঘেয়েমি থাকলে মানুষ খাবার-দাবার, বিনোদন, আসন ইত্যাদি নিয়ে অনুযোগ-অভিযোগ করে। কিন্তু, যাত্রা যেখানে একঘেয়ে হয়ে ওঠার সুযোগ পায় না, সেখানে এটা সেটা নিয়ে তেমন একটা অভিযোগ করার মানসিকতা থাকেনা।
হয়তো এটুকুই বাংলাদেশ বিমানের মূলধন। অন্যথায়, যদি সার্ভিসের কথা চিন্তা করা হতো, তাহলে হয়তো মানুষ আরো ভালো, যুগোপযোগী ও উপযুক্ত সার্ভিসের জন্য তুলকালাম কাণ্ড ঘটাতো।
(গল্পটি পুরাতন। তবে, সংবাদ২৪-এর জন্য নতুন)

গুলশান হামলার ১০ পর্যবেক্ষণ

Tabarakul Islam

মো: তবারুকুল ইসলাম

গুলশানের জিম্মি পরিস্থিতির শ্বাসরুদ্ধকর ১৩ ঘন্টা শেষে ১৩ জন মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। কমান্ডো বাহিনীকে এই ১৩টি প্রাণ রক্ষার কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়ে শেষ করা যাবে না।সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এই ঘটনায় ২০ বিদেশি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। নিহত হয়েছেন দুই পুলিশ কর্মকর্তা।সবচেয়ে ভাবনার বিষয় হলো- গুলশানের ঘটনাটি বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদের যে নজির স্থাপন করে দিয়েছে এবং এর ফলে মানুষের চিত্তে নিরাপত্তাবোধ নিয়ে যে আশঙ্কার বিজ বুনে দিয়েছে, সে ক্ষতি অপরিসীম এবং সূদুর প্রসারী।
দেশের এই সংকটকালীন সময়ে জাতীয় ঐক্য জরুরি। কিন্তু জাতীয় ঐক্যের দোহাই দিয়ে এই ঘটনা নিয়ে সমালোচনা, মতামত কিংবা বিশ্লেষণ নিরুৎসাহিত বা থামিয়ে দেয়া কি যৌক্তিক? দেশ ও দেশের মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে আইনশৃংখলা বাহিনী ও সরকারের গলদগুলো নিয়ে আলোচনা জরুরি।

১. কোনো মাতম উঠলো না
এ রকম একটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে দেশব্যাপী মানুষের মধ্যে মাতম উঠে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হামলায় তেমন কিছু দেখা গেল না। কারও কারও প্রতিক্রিয়ায় বরং উচ্ছাস ঝরে পড়ছিলো। তাদের ভাবখানা এমন- ‘আইএস নাই, আইএস নাই, দেখ এবার আইএস আছে কি নাই।’ কারও মতে, ‘সরকার যে পথে চলছে, তাতে এমনটা ঘটাইতো স্বাভাবিক।’ সরকারের প্রতি সংক্ষুব্ধ মানুষের প্রতিক্রিয়া আরও ভয়াবহ। তাদের মতে, ‘দেশ গোল্লায় যাক, তবু এই সরকারের একটা শিক্ষা হোক।’

২. ঘটনা শেষ হওয়ার আগেই রায় দেয়া শেষ
ঘটনার শুরু থেকেই সরকার সমর্থকরা বলতে লাগলেন, এটা বিএনপি-জামায়াতের কাজ। দেশে কোনো আইএস নাই। আর বিএনপি-জামায়াত সমর্থকরা বলছেন, ‘এটা একটা নাটক। ভারতীয় বাহিনীকে বাংলাদেশে ডেকে আনার জন্য সরকার এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে। অথবা ভারত শেখ হাসিনা সরকারকে আরও বেশি অনুগত ও বাধ্যগত করতে এমনটি করিয়েছে।’ এমন আগাম রায় দেশ, জনগণ কিংবা রাজনীতি- কোনো কিছুর জন্যই মঙ্গলজনক নয়।

৩. ধাক্কা খেল পুলিশ
গুলশানের ঘটনায় চরম ধাক্কা খেয়েছে পুলিশ। সাধারণ বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্মম অত্যাচার আর কথার আগেই গুলি চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অভ্যস্ত হয়ে উঠা পুলিশ বাহিনী আন্দাজও করতে পারেনি গুলশানের ঘটনার ভয়াবহতা। গতানুগতিন বিবেচনায় পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে দুইজন পুলিশ কর্মকর্তা প্রাণ দিয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩০ জনের বেশি।

৪. এতদিন তবে কাদের ধরা হলো?
গত ছয় বছর ধরেই জঙ্গি নির্মূল করছে এই সরকার। এই তো কদিন আগে তিনদিনে প্রায় ১৪ হাজার মানুষকে আটক করা হলো। তারপরও এই হামলা কী করে হলো? অনেকটা বিরতিহীনভাবে হত্যাকাণ্ড কারা ঘটাচ্ছে? বাংলাদেশ কি তবে জঙ্গি আর সন্ত্রসীতে ছেয়ে গেছে? নাকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গিদমনের নামে সরকারের বিরোধীপক্ষকে দমনে আটক অভিযান চালিয়েছে? যদি দেশ জঙ্গিতে ছেয়ে যায়, সেই ব্যর্থতা কি এই সরকারের নয়?

৫. গোয়েন্দারা কী করলো?
দেশের গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত এলাকায় এতবড় সন্তাসী হামলা হয়ে গেল। অথচ আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দারা আগাম কিছুই জানতে পারলো না? এত অস্ত্র, বিস্ফোরক নিয়ে সাত/আট জন সন্ত্রাসী কী করে যাতায়ত করতে পারলো? এ জন্য কী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দাদের জবাবদিহি হওয়া উচিত নয়?

৬. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোথায়?
এতবড় ঘটনা ঘটে গেল, দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখার দায়িত্ব যার, সেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে কিছুই শুনতে পেলাম না। সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ-বিদ্রোহ দমনে বিপুলভাবে সফল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সন্ত্রাসী হামলা মোকাবেলায় কতটুকু প্রস্তুত- সেটা জনগণকে জানানো জরুরি। দেশ ও দেশের মানুষকে নিরাপদ রাখতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উচিত ছিল সরকারের পদক্ষেপগুলোর বিষয়ে পরিষ্কার করা।

৭. সেনাবাহিনী ডাকতে কি কিছুটা দেরি হলো?
রাত দশটার দিকে পুলিশ হতাহত হওয়ার মধ্যদিয়ে ঘটনার ভয়বহতা প্রমাণ হয়েছে। এরপর সেনাবাহিনীকে তাৎক্ষণিক মাঠে নামানো উচিত ছিল। যে কারণেই হোক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চূড়ান্ত সাড়া দিতে যে বিলম্ব হয়েছে, তা মোটেই কাম্য ছিল না।

৮. প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য
প্রধানমন্ত্রী বরাবারের মত এবারও বেশ দৃঢ়তা নিয়ে পরিস্থিতি তদারক করেছেন বলে জানা যায়। কিন্তু তাঁর বক্তব্যে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যের ডাক থাকলে ভাল হতো। ভবি্ষ্যতে এই ধরণের ঘটনা রোধে পরিকল্পনা ও পদক্ষেপের কথা জানালে জনগণ কিছুটা আশ্বস্ত হতে পারতো।

৯. উন্নত দেশের কাতারে বাংলাদেশ
অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স কিংবা বেলজিয়ামের মত উন্নত দেশগুলোতে জিম্মি পরিস্থির ঘটনা আমরা দেখেছি। মনে করা হতো-পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোতেই কেবল এ ধরণের ভয়ঙ্কর হামলা ঘটতে পারে। গুলশানের ঘটনা বাংলাদেশকে সেইসব উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে গেছে। এই উন্নতি অবশ্য ভয়ঙ্কর এবং অনাকাঙ্খিত।
তবে এই ঘটনার মধ্যদিয়ে আমাদের সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বাংলাদেশকে ইউরোপ-আমেরিকার সাথে তুলনার আরও একটি মওকা পেয়ে গেলেন। তারা প্রায়ই বলেন, খুন খারাবি তো ব্রিটেন-আমেরিকাতেও হয়। এখন তারা বলবেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম কিংবা অস্ট্রেলিয়াতেও সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটছে।
তাদের কথায় মনে হয়, উন্নত দেশ হতে গেলে হত্যাকাণ্ড আর সন্ত্রাসী হামলার খুব দরকার।

১০. আস্থা অর্জন জরুরি
সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। কাজে-কথায় প্রমাণ করতে হবে তারা জনগণের সেবক। অন্যথায় তাদের কোনো ব্যাখা মানুষ বিশ্বাস করতে চাইবে না। নিজের মত করেই সব ঘটনার সারমর্ম বুঝে নেবে। এটা দেশের জন্য ভয়ঙ্কর। এই আস্থাহীনতাই গুলশানের ঘটনায় মাতম না উঠার বড় কারণ।

লেখক: প্রথম আলো’র লন্ডন প্রতিনিধি

লন্ডন, ২ জুলাই

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বিশেষ পাতা

ভাষার মুনাফা, প্রজন্মের আগ্রহ

ফকির ইলিয়াস

ভাষা নিয়ে গর্ব করার মতো অনেক কিছুই আছে। বিশেষ করে সেই ভাষা যদি মানুষের যাপিত জীবনের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। সে ভূমিকাটি কী রকম? তা হচ্ছে এরকম- একজন ইংরেজি ভাষাভাষী আমেরিকান, তার ব্যবসার প্রয়োজনে চীনে গিয়ে চাইনিজ ভাষাটি শিখে নিচ্ছেন। বাংলা ভাষায় কবিতা লিখেছিলেন জীবনানন্দ দাশ। বাংলা ভাষায় গান লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আজ সেই কবিতা, সেই গান অন্য ভাষায় অনূদিত হচ্ছে। পাশ্চাত্যের কোনো প্রকাশনী তা প্রকাশ করে লুটে নিতে চাইছে মুনাফা। সবই হচ্ছে বাণিজ্যের কারণে। ভাষা যদি মুনাফা লাভের সিঁড়ি হয়ে ওঠে, তাহলে তা যে কোনো মহলে আদৃত হবে না কেন ? বাংলাদেশই বাংলা ভাষার চারণভূমি হিসেবে টিকে থাকবে। কথাগুলো বলছেন বাংলা ভাষাভাষী অনেক প্রাজ্ঞজন। অথচ এ বাংলাদেশেই এখন অনেক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। অভিভাবকরা জানেন ও বোঝেন তাদের সন্তানদের বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। ভাষাবিদ্যায় পারদর্শী হওয়ার কথা ভাবলে আমরা যে চিত্রটি প্রথমেই দেখি, তা হচ্ছে একটি অগ্রসরমান প্রজন্মর ভবিষ্যৎ। তা নির্মাণে প্রয়োজন নিরলস অধ্যবসায়। একটি প্রজন্ম শক্তিশালী হয়ে দাঁড়াতে দুটি বিষয়ের প্রয়োজন পড়ে খুব বেশি। প্রথমটি হচ্ছে সৎভাবে সমাজের অবকাঠামো নির্মাণ। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে সমকালের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কর্মপরিধির ব্যাপ্তি ঘটানো। কাজ করতে হলে একটি যোগ্য কর্মীবাহিনীর প্রয়োজন পড়ে, যারা তাদের মেধা ও মনন দিয়ে কাজ করবে নিরন্তর। জ্ঞানার্জনে ভাষা একটি ফ্যাক্টর তো বটেই। কারণ মানুষ না জানলে, সেই তথ্য-তত্ত্ব এবং সূত্রগুলোকে নিজের জীবনে, সমাজজীবনে প্রয়োগ করতে পারে না। সেজন্য প্রয়োজন পড়াশোনা। পড়াশোনা করতে হলে শিক্ষার প্রয়োজন। প্রয়োজন সেই ভাষাটিও রপ্ত করা। বাংলাদেশের নিরক্ষর মানুষ প্রয়োজনীয় অক্ষরজ্ঞান পেলে নিজেদের জীবনমান যেমন বদলাতে পারবেন, তেমনি পারবেন সমাজের চিত্রও বদলে দিতে। একজন শিক্ষিত মা-ই পারেন একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দিতে। আমরা সে কথাটি সবাই জানি এবং মানি। ভাষার যত রকম প্রয়োজনীয়তার সংজ্ঞা আমরা তুলি না কেন, প্রধান কথাটি হচ্ছে একটি জাতিকে শিক্ষিত করে তোলার গুরুত্ব। মানুষ সুশিক্ষিত হলেই তার জ্ঞান খুলবে, সে উদার হবে, সৎ কাজগুলো করবে। এটাই নিয়ম। পাশ্চাত্যে আমরা উচ্চশিক্ষিতের যে হার দেখি, ওই জনশক্তিই রাষ্ট্র গঠন, পরিচালনায় একটি বিশেষ ভূমিকা রাখছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমার এক বন্ধু নিউইয়র্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। পোলিশ এ বন্ধুটির সঙ্গে আমার নানা বিষয়ে কথা হয়। সমাজবিদ্যার এ শিক্ষক আমাকে বারবার বলেন, শক্তিশালী ভাষাই বিশ্বে পুঁজির আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ করছে। তার কথাটি মোটেই মিথ্যা নয়। নিউইয়র্ক তথা গোটা উত্তর আমেরিকার একটি বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা নরটন অ্যান্ড কোম্পানির বেশ কয়েকজন কর্ণধারের সঙ্গে ‘ভাষা ও সাহিত্য’ বিষয়ে আড্ডা দেয়ার সুযোগ হয়েছে। তারা একবাক্যে বলতে চান, মুনাফার লোভেই তারা মহাকবি ওমর খৈয়াম, জালালুদ্দিন রুমী থেকে নাজিম হিকমত, রবীন্দ্রনাথ কিংবা মাহমুদ দারবিশের রচনাবলিকে ইংরেজিতে অনুবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, নিজস্ব আঙ্গিকে। তারা তা ইংরেজিতে ছাপিয়েছেন। বাজারজাত করেছেন। এতে বিশ্বসাহিত্যে এসব মহৎ লেখক যেমন আদৃত হচ্ছেন কিংবা হয়েছেন, তেমনি তাদের বই বিক্রি করে আয় হয়েছে লাখ লাখ ডলারও।
বাংলা ভাষার সন্তান বাঙালি জাতি। জাতিসত্তা থেকে এ চেতনা আমরা কোনো মতেই সরাতে পারব না। পারার কথাও নয়। কিন্তু এই বলে আমরা অন্যভাষা রপ্ত করব না বা করার আগ্রহ দেখাব না; তা তো হতে পারে না। এখানেও অর্থনৈতিক প্রতিপত্তির বিষয়টি আগে আসে খুব সঙ্গত কারণে। ভারতের কেরালা ও তামিলনাড়ু নামে দুটি অঙ্গরাজ্যের কথা আমরা জানি। কেরালা অঙ্গরাজ্যের মানুষ দুটি ভাষা জানেন বিশেষভাবে। একটি কেরালাদের নিজস্ব ভাষা মালেআলাম আর অন্যটি ইংরেজি। সেখানে হিন্দির তেমন দাপট নেই। একই অবস্থা তামিলনাড়ুতেও। তারা তামিল এবং ইংরেজি ভাষায় দক্ষ। বিদেশে চাকরি নিয়ে কেরালা-তামিল থেকে যারা আসেন, দেখলে মনে হয় ইংরেজি যেন তাদের মাতৃভাষাই। তাদের লক্ষ্যটি হচ্ছে, ভাষার আলো গ্রহণ করে একজন দক্ষ আইন প্রফেশনাল কিংবা টেকনোলজিস্ট হওয়া। আর সেজন্য তারা ইংরেজিকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন স্কুলজীবন থেকেই। স্যাটেলাইট টিভির বিভিন্ন চ্যানেলে বাংলাদেশের বইমেলার ওপর অনুষ্ঠানগুলো প্রতিদিনই দেখি। মনে পড়ছে একবার একটি অনুষ্ঠানে দেখেছিলাম, একজন লেখক তার বইয়ের প্রচার করছেন একটি লাইভ অনুষ্ঠানে। তার গ্রন্থের বিষয় কীভাবে আলুর অধিক ফলন করা যায়। বিষয়টি চমকপ্রদ। বর্তমান বিশ্বে আলু চাষের প্রতিযোগিতা চলছে। খাদ্য হিসেবে পাশ্চাত্যে বিভিন্ন আইটেমের আলুখাদ্য জনপ্রিয় হলেও প্রাচ্যে তা জনপ্রিয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমি মনে করি একজন শিক্ষিত কৃষক ক্ষুদ্র আকারে তার নিজের অধিক ফলন অভিজ্ঞতা বিষয়টি হাতে লিখে, কম্পোজ করিয়ে অন্যদের মাঝে বিতরণ করতে পারেন। বিষয়টি ক্ষুদ্র হলেও প্রধান দিকটি হচ্ছে একজন শিক্ষিত কৃষকই তা পারবেন। আর সেজন্যই শিক্ষার বিষয়টি আগে আসছে। শিক্ষিত হলেই মনের প্রখরতা বাড়ে। আর শিক্ষাগ্রহণ করা যায় জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত। প্রতি বছর বাংলাদেশে ভ্রমণবিষয়ক অনেক বই বের হয়। ট্যুরিজম আজকের প্রজন্মের একটি শখের বিষয়। সিলেট কিংবা রাঙ্গামাটিতে কী দেখা যাবে- তা জানতে পারছে তারা ওই বই পড়েই। কয়েক বছর আগে আমরা ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের কয়েকটি কৃষিফার্ম সফর করতে গিয়েছিলাম। ফ্লোরিডায় বেশকিছু ফার্ম আছে, যেগুলোর সব কর্মীই স্প্যানিশ ভাষাভাষী। এরা ইংরেজি একটি অক্ষরও জানেন না। সেখানে কৃষিবিষয়ক সরকারি পুস্তিকাগুলো স্প্যানিশ ভাষায়ই বিতরণ করা হয় সরকারি উদ্যোগে। হ্যাঁ, ভাষার আলো ছড়িয়ে দিতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা উদ্যোগের প্রয়োজন খুবই জরুরি। বাংলাদেশের ভেতরে আদিবাসী ভাষার অনেক কবি, সাহিত্যিক, মনীষী, চিন্তাবিদ, দীক্ষক আছেন যাদের নামটি পর্যন্তও হয়তো আমরা জানি না। তাদের চিন্তাচেতনা যদি বাংলায় রূপান্তরিত হতো তবে বাংলা ভাষাভাষীরা হয়তো তা জেনে উপকৃত হতে পারতেন। একই দেশের ভেতরেই আছে অনেক ভাষা। আর এক বিশ্বে কত ভাষা আছে তা জানার সুযোগ হয়তো সব মানুষের পুরো জীবনেও আসবে না। আমি সব সময়ই রূপান্তরে বিশ্বাস করি। রূপান্তরই হচ্ছে ফিরে আসা, অনূদিত হওয়া কিংবা বিবর্তিত হওয়া। বিবর্তন না হলে নতুনের উন্মেষ ঘটে না। তুলনামূলক আলোচনা ছাড়া জানা যায় না বিশ্বের ভাষার নান্দনিক বিবর্তন কীভাবে ঘটছে। লক্ষ করেছি, চলতি সময়ে বইমেলায় বেশকিছু দুর্লভ প্রাচীন ভাষা ও সাহিত্য যেমন চর্যাপদ, সিলেটি নগরী, আদিবাসী শ্লোক নিয়ে বেশ কাজ হয়েছে। আজকের লেখকরা বাংলা ভাষায়ই লিখছেন ক্যারিয়ার গড়াবিষয়ক বই। ওপরে কীভাবে উঠবেন। চাকরির সিঁড়ি কীভাবে নির্মাণ করবেন। ভাষা প্রয়োজনেই শেখে মানুষ। নিউইয়র্কের একজন নতুন প্রজন্মের বাঙালি-মার্কিন আইনজীবীকে জানি যিনি তার পেশাগত কারণেই শিখে নিয়েছেন বাংলা ভাষা, বাংলা অভিধান তালাশ করে। এগুলো আশার বিষয়। আমি মনে করি এসব উৎস সন্ধানই প্রজন্মকে স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি সাধনের পাশাপাশি ভাষা ও সাহিত্য অঙ্গনেও এগিয়ে যাবে স্বপ্নের বাংলাদেশ। বাংলাদেশে এখন বইমেলা চলছে। বই প্রকাশিত হতে শুরু করেছে লন্ডন, নিউইয়র্ক থেকেও স্থানীয় বাংলা প্রকাশনীর মাধ্যমে। কারণ বাংলা কম্পোজ এখন খুবই সহজ।
বিভিন্ন ভাষার বেশ কিছু অনুবাদগ্রন্থ এরই মধ্যে বেরিয়েছে। বাংলাদেশের প্রকাশকরা অনুবাদ গ্রন্থের প্রতি যত মনোযোগী হবেন, ততই লাভ বাংলা ভাষার। বাংলা সাহিত্যের। মূল কথা হল, সাহিত্যের রস আস্বাদন করা। তা যদি ইংরেজিতেও হয় ক্ষতি কী? ভাষার আলো গ্রহণের একটা প্রতিযোগিতা চলছে আজকের বিশ্বে, নিজেকে টিকিয়ে রাখার কারণেই। বাঙালি প্রজন্ম তা থেকে পিছিয়ে থাকবে কেন? মনে রাখতে হবে, ‘ভাষার অর্থনীতি’ নামে একটি শক্তি এখন প্রজন্মের দরজায় কড়া নাড়ছে। যত জ্ঞান-তত অর্থ, এমন একটা নীতি চালাতে চাইছে পশ্চিমা বিশ্ব। ফলে প্রযুক্তির শক্তির পাশাপাশি ভাষার শক্তিও দিনে দিনে প্রখর হচ্ছে। যে আলো ধারণ করা প্রয়োজন প্রতিটি অগ্রসরমান মানুষেরই।

(ফকির ইলিয়াস : যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক)

এ সময়ের ভাষা প্রশ্ন ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
এ কে এম শাহনাওয়াজ

সপ্তাহ দুই আগে একটি টিভি চ্যানেলের খবরে বর্তমান সময়ের পারিবারিক ভাষা চেতনা নিয়ে একটি রিপোর্ট দেখলাম। এক পরিবারের ৫ থেকে ৭ বছরের দুই শিশু ইংরেজি ভাষায় নির্মিত কার্টুন দেখছিল। মা বলছেন তারা সন্তানদের এসব কার্টুন দেখাতে অভ্যস্ত করাচ্ছেন। কারণ এতে ওদের ইংরেজি শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে। আরেক পরিবারের ৮ থেকে ১০ বছরের দুজন শিশু হিন্দি সিরিয়াল দেখায় অভ্যস্ত। ওরা শোনাল টিভি দেখে দেখে কীভাবে হিন্দি ভাষা রপ্ত করেছে। অবশ্য এতে ওদের বাবা-মা কতটা গর্বিত তা রিপোর্টার দেখাননি। তবে বছর কয়েক আগে আমার এক আত্মীয়াকে গর্ব করে বলতে শুনেছি টিভি সিরিয়াল দেখে এখন ওর মেয়েটি কী চমৎকার হিন্দি বলতে পারে। হিন্দি গান গাইতে পারে। বলিউডের নায়িকাদের মতো নাচের চেষ্টা করে। আমি একটি প্রথম শ্রেণীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে একবার বাংলা ভাষায় লেখা রেফারেন্স বই দিয়েছিলাম। ওর করুণ মুখটা এখনও আমার চোখে ভাসে। দ্বিধা ও হতাশা মিশিয়ে বলেছিল, ‘স্যার আমি বাংলা পড়তে ও লিখতে পারি না।’ এছাড়া পেশা এবং শিক্ষা নির্বিশেষে এখন তো অনেক বাঙালি পরিবার নিজ ছেলেমেয়ের বিয়ের দাওয়াতপত্র ইংরেজি ভাষায় ছেপে বিতরণ করতেই গর্ব বোধ করেন। আমি নিশ্চিত নই ইংরেজি শব্দভাণ্ডার তৈরির জন্য বুদ্ধিমতী মা যখন ইংরেজি ভাষার কার্টুন দেখান সন্তানকে, তিনি ততটা সতর্ক থাকেন কিনা তার সন্তানের মাতৃভাষার শব্দভাণ্ডার কেমন বা শুদ্ধ বাংলা লিখতে পারে কিনা। হিন্দি শেখার পাশাপাশি পরিশীলিত বাংলা অনুষ্ঠান (যদি তেমন অনুষ্ঠান আদৌ প্রচারিত হয়) দেখতে উৎসাহিত করেন কিনা বাংলা ভাষায় দক্ষ হওয়ার জন্য। এসব বাস্তবতা দেখে এবং ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ছড়াছড়ি ও নানা পেশা এবং আয়ের পরিবারগুলোর সন্তানদের এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির হুড়োহুড়ি দেখে আমার সন্দেহ জাগে, এতকাল পরে এসে পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হয় জিতে যাচ্ছে।সাম্রাজ্যবাদী বা সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার শক্তিগুলো জানে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শক্তি একটি দেশের মানুষকে বীর্যবান করে তোলে। যেহেতু সাহিত্য-সংস্কৃতির বাহন ভাষা তাই এই অশুভ শক্তিগুলো আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে নিজভাষা চর্চা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে সচেষ্ট থাকে। তারা জানে মাতৃভাষাচর্চা বিচ্ছিন্ন করতে পারলে। স্বাজাত্যবোধের জায়গাটি দুর্বল হয়ে যাবে। আর আধিপত্যবাদী শক্তির ভাষা যদি এদের ওপর চাপিয়ে দেয়া যায় তবে পরাজিতরা তাদেরই প্রভু মানবে। ফলে মনোবাঞ্ছামতো শোষণ চালিয়ে যাওয়া তেমন কঠিন হবে না।সেই এগারো শতকে ব্রাহ্মণ সেন রাজারা অভিন্ন চিন্তা করেছিল। বিদেশী সেন বংশীয় শাসকরা অন্যায়ভাবে দখল করেছিল বাংলার সিংহাসন। লড়াকু বাঙালির ঐতিহ্যিক শক্তির কথা তারা জানত। তাই বাঙালির প্রতিবাদী সত্তা জেগে ওঠার আগেই তাদের ঐতিহ্যিক শক্তি বিচ্ছিন্ন করতে চাইল। বাংলা ভাষার ওপর আঘাত হানল। এদেশের সাধারণ বাঙালিকে শূদ্র বর্ণভুক্ত করে তাদের জন্য বাংলা ভাষা চর্চা নিষিদ্ধ করে দিল। পরবর্তী বিদেশাগত মুসলমান সুলতানদের মতো উদার শাসকদের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি সেখানেই মুখ থুবড়ে পড়ত। মুসলিম শাসনের ছয় শতাধিক বছর রাষ্ট্রভাষা ফারসি হলেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার দ্বার অবারিত ছিল। ইংরেজ শাসকরা শোষণ চিন্তা মাথায় রেখে এদেশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। তারাও বুঝেছিল বাঙালিকে সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহ্যিক শক্তি বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হলে মাতৃভাষা বিচ্ছিন্ন করতে হবে। কিন্তু ইংরেজরা ছিল বুদ্ধিমান জাতি। তারা বুঝেছিল নানা ভাষায় কথা বলা জাতি বাস করে ভারতজুড়ে। আজ হুট করে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ইংরেজি চাপিয়ে দিলে নানা অঞ্চলেই মানুষ ক্ষুব্ধ হতে পারে। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই ওরা অপেক্ষা করতে চাইল। ওরা বিশ্বাস করেছিল একদিন ভারতবাসীই ইংরেজি ভাষার প্রতি আনুকূল্য দেখাবে। তখন ইচ্ছে পূরণের নীতিনির্ধারণে কষ্ট হবে না। ইংরেজরা জানল ছয় শতাধিক বছর ধরে এদেশের সরকারি ভাষা ফারসি। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ফারসি ব্যবহারে ভারতবাসী অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তাই বুদ্ধিমান ইংরেজরা ভারতবাসীকে বিভ্রান্ত না করে জানিয়ে দিল আগের মতো ফারসিতেই হবে সরকারি কাজকর্ম। নিজেদের সংকট উত্তরণের জন্য সরকারি অফিসে ‘নেটিভ’দের জন্য একটি পদ তৈরি করা হল। যার নাম ছিল ‘মুন্সি’। ভালো ইংরেজি এবং আরবি-ফারসি জানা ভারতীয় এ চাকরি পাওয়ার যোগ্য ছিল। অমন সরকারি চাকরি পাওয়ার আশায় অনেক শিক্ষিত হিন্দু বাঙালি মুসলমান মৌলভীদের কাছে এসে আরবি-ফারসি শিখতেন। এ মুন্সিদের লেখা ও দোভাষী হিসেবে ভূমিকাকে অবলম্বন করে শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করেছিল ইংরেজ শাসকরা। উনিশ শতকের শুরুতে খ্রিস্টান মিশনারি স্যার উইলিয়াম কেরি এবং পরে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, নওয়াব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমির আলী প্রমুখ শিক্ষিত বাঙালির চেষ্টায় এদেশের হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়কে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি মনোযোগী করার জন্য জনমত তৈরি হতে থাকে। এভাবে অনুকূল অবস্থার সৃষ্টি হলে ১৮৩৫ সালে ইংরেজিকে সরকারি ভাষা করা হয়। আর তখন তা সাদরেই মেনে নেয় ভারতীয়রা। প্রায় অভিন্ন উদ্দেশ্য থাকলেও বুদ্ধির দৌড়ে পিছিয়ে পড়া পাকিস্তানি শাসকরা নীতিনির্ধারণে গুবলেট পাকিয়ে ফেলল। পূর্ব ভারতের বাঙালি আর উত্তর-পশ্চিম ভারতের অবাঙালি মুসলমানরা একযোগে পাকিস্তান আন্দোলন করেছিল। ভারত ভাগ হয়ে স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হলেও রাষ্ট্রক্ষমতা চলে যায় অবাঙালি পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। এতে বাঙালি নেতাদের খেদ ছিল না। তারা ভাই বলেই গ্রহণ করেছিল শাসকদের। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের মনে ছিল উর্বর পূর্ব বাংলাকে শোষণ করা। পাশাপাশি হাজার বছরের লড়াকু বাঙালির কথাও তাদের জানা ছিল। দীর্ঘ ঐতিহ্যের প্রেরণা বাঙালির মধ্যে তীব্র স্বাজাত্যবোধ তৈরি করেছে। এ সত্য ঠিক অনুভব করতে পেরেছিল শাসকচক্র। তাই পরবর্তী প্রজন্মের বাঙালিকে মাতৃভাষা চর্চা বিচ্ছিন্ন করতে চাইল। এতেই ঐতিহ্য বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। শাসকদের উর্দু ভাষায় অভ্যস্ত হলে তাদের প্রভু মানতে দ্বিধা থাকবে না। তখন বিনা প্রতিবাদে বাংলাকে শোষণ করতে পারবে। তাই পাকিস্তান জন্মের পর আর অপেক্ষা করতে তর সইছিল না। ১৯৪৭-এর ডিসেম্বরেই বাঙালির ওপর উর্দু চাপিয়ে দেয়ার জন্য কোমর বেঁধে নেমে পড়ল পাকিস্তানি শাসকচক্র। কিন্তু বুদ্ধির দিক থেকে ইংরেজদের চেয়ে পিছিয়ে থাকা পাকিস্তানিরা সোনার ডিমপাড়া হাঁস একবারে জবাই করে সব ডিম পেতে চাইল। একবারও বিবেচনা করল না ছয়-সাতশ বছর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা হয়েছে এ দেশে। তাই বাঙালির বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির শক্তির মূল মাটির গভীরে প্রথিত। পরিবেশ তৈরি না করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চাইলে প্রতিবাদতো হবেই। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির শক্তিই শেষ পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনকে সফল করেছিল। অনেককাল পর প্রায় অভিন্ন উদ্দেশ্যে আবার আগ্রাসন চিন্তায় বাংলা ভাষার ওপর আক্রমণ শুরু হয়েছে। এটি এক ধরনের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের যুগ। পাশ্চাত্য দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নানাভাবে অর্থনৈতিক শোষণ করতে তৎপর। সামরিক শক্তিবলয় তৈরি করতে কোনো কোনো দেশ চায় এসব দেশকে অবলম্বন করে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে বড় বাধা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ দেশগুলোর মানুষের স্বাজাত্যবোধ। তারা প্রতিবাদী হয় বলে আগ্রাসনবাদীদের লক্ষ্যপূরণ কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে বিশ শতকের পাকিস্তানিদের মতো করে নয় আঠার-উনিশ শতকের ইংরেজ ঔপনিবেশিক নেতাদের মতো করে ধীরে ধীরে প্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিচ্ছিন্ন করতে চাইছে। এসব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পথ ধরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল। শুধু উচ্চবিত্ত নয়, মধ্যবিত্ত ও নিুমধ্যবিত্ত অনেক পরিবারের মধ্যে ইংরেজি মাধ্যমে সন্তানকে পড়ানোর মিথ্যা আভিজাত্যের লোভ ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। মাঝারি বড় সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার মাধ্যম রাখা হয়েছে ইংরেজি। মেধা ও পরিচর্যা দুই বিচারেই এসব শিক্ষার্থীর বড় অংশ না বাংলা না ইংরেজি কোনো ভাষাতেই দক্ষ হয়ে উঠতে পারছে না। এসব শিক্ষার্থীর বড় অংশ শুধু বাংলা সাহিত্য এবং বাংলা ভাষায় লেখা বইপড়া ও সংস্কৃতিচর্চা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে তাই নয়, ইউটিউব আর ফেসবুক সংস্কৃতিতে জড়িয়ে সংবাদপত্র পড়াও ভুলে যাচ্ছে। পাশ্চাত্য শক্তির এ অশুভ তৎপরতার সহায়ক বন্ধু হয়ে দেখা দিয়েছে আমাদের অনেক টিভি চ্যানেল ও বেসরকারি রেডিও চ্যানেল। এখানে তারুণ্যের ক্রেজ বলে এক অদ্ভুত দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলা ‘দর্শক’ শব্দ ভুলিয়ে ‘হাই ভিউয়ার্স’ সংস্কৃতির কর্ষণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষায় অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের বড় অংশ পড়ছে কওমি ধারার মাদ্রাসায়। সেখানেও মাতৃভাষা চর্চার জায়গাটি ভীষণ সংকুচিত। ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ও কওমি মাদ্রাসা শিক্ষায় দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানার সুযোগ নেই বললেই চলে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চার দীর্ঘ ঐতিহ্য বাঙালিকে আত্মশক্তিতে বলীয়ান করেছিল। তাই আমাদের পুর্বসূরিরা জীবনপণ করে ভাষার লড়াইয়ে পথে নামতে পেরেছিলেন। কিন্তু এ সময়ে এসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর যেভাবে আগ্রাসন চলছে এবং তা আমরা যেভাবে নীরবে মেনে নিচ্ছি তাতে বাঙালির একটি বিপর্যস্ত ছবিই ভেসে উঠছে। ভাষা আন্দোলনের স্বাতন্ত্র্য ধারণ করা প্রভাতফেরিকে কোনো প্রতিবাদ ছাড়া যেভাবে ‘মধ্যরাতের প্রভাতফেরি’ বানিয়ে দিয়েছি, তাতে বোঝা যায় আগ্রাসনবাদী পাশ্চাত্য শক্তি কতটা অগ্রসর হতে পেরেছে। দুঃখ হয় এই ভেবে যে, অগ্রজরা ভাষার লড়াই করে আমাদের আত্মমর্যাদাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ করে আত্মপরিচয়কে সুনির্দিষ্ট করেছিলেন, যে গৌরবের পথ ধরে ২১ ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পেয়েছে, তাদেরই উত্তরসূরি হয়ে আমরা অবলীলায় মাতৃভাষাকে অসম্মানিত করে নিজেদেরই পরাজিত করছি।
(ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়)

মাতৃভাষার আন্তর্জাতিক সম্মানের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে
ড. সাদত হুসাইন

দিনটি ছিল ১২ নভেম্বর ১৯৯৯। ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ সম্মেলনের কমিশন-২-এর অধিবেশন চলছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব উত্থাপিত হবে। আগের দিনই প্রস্তাবটি উত্থাপনের কথা ছিল; কিন্তু সময় স্বল্পতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে আমরা যারা ছিলাম, প্রস্তাবের পরিণতি কী হতে পারে তা নিয়ে সবাই ছিলাম উত্তেজিত ও উদ্বিগ্ন। বেশ কিছুদিন ধরে এ নিয়ে জোরালো লবিং চলে আসছিল। শিক্ষামন্ত্রী এএসএইচকে সাদেক ছিলেন এর নেতৃত্বে। প্রতিনিধি দলের প্রধান হিসেবে তিনি তার বক্তৃতায় একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছিলেন এবং দিবসটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করার জন্য অন্য দেশের প্রতিনিধিদের আবেদন জানাচ্ছিলেন। কমনওয়েলথের সদস্য দেশগুলোর সমর্থন আদায়ের জন্য প্যারিসের বাংলাদেশ দূতাবাসও কঠোর পরিশ্রম করছিল। ফলে পাকিস্তানসহ ২৮টি দেশ বাংলাদেশের প্রতি আনুষ্ঠানিক সমর্থন দিতে সম্মত হয়। প্রায় দশ দিন প্যারিসে অবস্থান করে শিক্ষামন্ত্রী দেশে ফিরে আসেন। পরে প্রতিনিধি দলের উপপ্রধান হিসেবে আমার পালা আসে সেখানে দলের সঙ্গে যোগ দেয়ার। প্যারিস সম্মেলনে যোগদানের প্রাক্কালে মন্ত্রী প্রস্তাবটি সম্পর্কে আমাকে ব্রিফ করেন এবং কিছু কিছু মহল থেকে বাড়তি অর্থনৈতিক বোঝা চাপার অজুহাত দেখিয়ে প্রস্তাবটির বিরোধিতা আসা সত্ত্বেও তিনি যথেষ্ট আশাবাদী ছিলেন যে, প্রস্তাবটি সম্মেলনে গৃহীত হবে। পরে ঢাকায় বসেও তিনি নিয়মিত এর কতদূর কী হল, সে বিষয়ে খোঁজখবর রেখেছেন। কমিশন-২-এর অধিবেশনে প্রস্তাবটি পেশ করার নির্ধারিত সময়ের কয়েক মিনিট আগে আমাকে প্লেনারিতে যেতে হয় ইউনেস্কোর মহাসচিব নির্বাচনে ভোট দেয়ার জন্য। ফ্রান্সে আমাদের রাষ্ট্রদূত এবং ইউনেস্কোয় স্থায়ী প্রতিনিধি সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল প্রস্তাবটি কমিশনে উপস্থাপনের। আমি খুব চিন্তিত ছিলাম যে, প্রস্তাবটি উত্থাপনের এরকম একটি মুহূর্তে আমি হয়তো উপস্থিত থাকতে পারব না। কিন্তু ভাগ্য আমার প্রতি সুপ্রসন্ন ছিল। তাই অন্যান্য প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘায়িত হওয়ায় আমাদের প্রস্তাবটির উত্থাপন কিছুটা বিলম্বিত হয়। ফলে সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী প্রস্তাবটি কমিশন-২-এর সামনে উত্থাপনের আগেই আমি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে যোগ দেই। প্রতিনিধি দলে আমি ছাড়া অন্যদের মধ্যে ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক সাইদুর রহমান, বাংলাদেশের ইউনেস্কো জাতীয় কাউন্সিলের সচিব অধ্যাপক কফিল উদ্দিন আহমদ এবং ফ্রান্সে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর ইকতিয়ার চৌধুরী।
এছাড়া ইউনেস্কো মহাপরিচালকের বিশেষ উপদেষ্টা টনি (তোজাম্মেল) হকও আমাদের সঙ্গে ছিলেন। রাষ্ট্রদূত মোয়াজ্জেম আলী তার কাজটি ঠিকমতোই করছিলেন। আমাদের সঙ্গে ব্যাপক শলাপরামর্শের মাধ্যমেই তিনি তার বিবৃতিটি তৈরি করেছিলেন। বিবৃতিতে তিনি যোগাযোগের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে এবং নিজেকে ব্যক্ত করার উপায় হিসেবে মাতৃভাষার গুরুত্বের ওপর আলোকপাত করেন। তিনি লেখেন, ভাষা সমাজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মর্মমূলে প্রোথিত। মাতৃভাষায় কথা বলা ও লিখতে পারার অধিকার এক অবিচ্ছেদ্য অধিকার, যা আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করতে এবং শান্তির সংস্কৃতিকে জাগ্রত করতেই সংরক্ষণ করা একান্ত প্রয়োজন। পৃথিবীর অনেক ভাষা হারিয়ে গেছে এবং অনেক ভাষার অস্তিত্বও আজ হুমকির মুখে। কাজেই আমরা যদি মাতৃভাষার গুরুত্বকে স্বীকৃতি না দেই, তাহলে জনগণের মত প্রকাশের অধিকার বাস্তবায়িত হবে না এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সম্ভাবনাও হারিয়ে যাবে। বিশ্বের বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায় তাদের মাতৃভাষা রক্ষায় সংগ্রাম করেছে, তবে মাতৃভাষার জন্য বাংলাদেশের সাহসী ছেলেদের জীবনদান ও সাফল্য এ ক্ষেত্রে আলাদা মর্যাদার দাবি রাখে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) ভাষা আন্দোলনে শহীদরা ঢাকার রাজপথে নিরাপত্তা বাহিনীর বুলেটে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেয়। বিশ্বের ভাষা ও যোগাযোগের ইতিহাসে এ ঘটনা বিশেষ স্বীকৃতির দাবি রাখে। সুতরাং জীবনের বিনিময়ে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি যারা মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষারূপে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মাতৃভাষাকে রক্ষা করে গেল, তাদের সে আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে সারা বিশ্বে দিনটিকে যৌক্তিক কারণেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা উচিত। বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল সদস্য দেশগুলোর কাছে যোগাযোগের মাধ্যম ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে মতৃভাষার প্রতি যথাযথ মর্যাদা জ্ঞাপন করার পথ হিসেবে এ প্রস্তাবের প্রতি তাদের সমর্থন জানানোর অনুরোধ জানায়। প্রস্তাবে এও বলা হয় যে, প্রতিটি দেশ যেহেতু নিজের মতো করে দিবসটি পালন করতে পারবে, কাজেই এজন্য অতিরিক্ত ব্যয়ের কোনো প্রয়োজন হবে না। সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের প্রস্তাব মেনে নেন। একজনও এর বিরোধিতা করেননি, এমনকি কেউ কোনো সংশোধনীও আনেননি। ফলে কমিশনে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এরপর বাকি থাকে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তা সম্মেলনের প্লেনারিতে পেশ করা। ততক্ষণে আমরা জেনে গেছি, প্রধান বাধাটি আমরা অতিক্রম করে ফেলেছি। প্লেনারিতে পেশ করা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। যা হোক, প্লেনারি অনুষ্ঠানের জন্য আমাদের ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল। ইতিমধ্যে আমরা কমিশন-২-এর খসড়া রেজুলেশনটি যথাযথভাবে লেখা হয়েছে কি-না তা নিশ্চিত করে নিলাম। অন্যদিকে ঢাকায় শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সার্বক্ষণিকভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে তার পরামর্শ নিচ্ছিলাম। প্রস্তাবের কোনো শব্দ বা বাক্যে ভুল রইল কি-না সে ব্যাপারে জানার জন্য কমনওয়েলথ মহাপরিচালকের কার্যালয় ও সচিবালয়ের মধ্যে জোর লিয়াজোঁ রক্ষা করছিলেন টনি হক। শেষ মুহূর্তেও যাতে কোনো ধরনের ঝামেলা না দেখা দেয়, সেজন্য সব ধরনের পূর্বসতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছিল। সর্বশেষ এলো ১৭ নভেম্বর ’৯৯। আমাদের বহু কাক্সিক্ষত সেই চূড়ান্ত মুহূর্তটি। কমিশন-২-এর চেয়ারম্যান বিভিন্ন খসড়া প্রস্তাবসহ তার রিপোর্ট উপস্থাপন করলেন সাধারণ সম্মেলনে পাস করানোর জন্য। খুব কম সময় আলোচনা চলল এবং সর্বসম্মতিক্রমে সব প্রস্তাব পাস হয়ে গেল। ইউনেস্কো সাধারণ সম্মেলনের ৩০সি/ডিআর ৩৫ প্রস্তাবে লেখা হল- ‘২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসরূপে পালনের ব্যাপারে সাধারণ অধিবেশনের ঘোষণা এখন থেকে ইউনেস্কোর সাধারণ অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হল।’ সঙ্গে সঙ্গেই সংবাদ পাঠিয়ে দেয়া হল দেশে। শিক্ষামন্ত্রী এএসএইচকে সাদেক তাৎক্ষণিকভাবে সংবাদ সম্মেলন ডেকে সংবাদপত্রগুলোকে সুখবরটি জানিয়ে দিলেন। আমরা প্রতিনিধি দলের সদস্যরা ইউনেস্কো সদর দফতরের কাছে ক্যাথি রয়্যাল রেস্তোরাঁয় মধ্যাহ্ন ভোজ খেয়ে সেলিব্রেট করলাম। টনি হক আমাদের সঙ্গে ছিলেন। এটা ছিল একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এমন একটি ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত থাকতে পেরে আমি ছিলাম উচ্ছ্বসিত। এ ধরনের কোনো ঘটনায় অংশ নিতে পারলে যে কেউই নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করবে। যা হোক, এবার একটু পেছনে ফিরে যাই। বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক মর্যাদাদানের এ ঐতিহাসিক ও অনন্য সাধারণ প্রক্রিয়াটির সূচনা করেছিলেন কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশীরা। বাংলাদেশ ডেলিগেশন সেটি ইউনেস্কোর ৩০তম সম্মেলনে উত্থাপন করে এবং সাফল্য পায়। কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশীদের এ উদ্যোগের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রফিকুল ইসলাম, যার নাম এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। এরকম একটি ঐতিহসিক মুহূর্তে আমি খানিকটা আনমনা হয়ে উঠি। স্মৃতিতে ভেসে ওঠে ১৯৫২ সাল ও তার পরবর্তী সময়ের কথা। একটি জেলা শহরে তখন আমি দ্বিতীয় গ্রেডের ছাত্র। বুঝতাম না মাতৃভাষা কী, আর এর গুরুত্বই বা কী। যেটুকু মনে আছে তা হচ্ছে, ঢাকায় কয়েকজনকে মেরে ফেলা হয়েছে এবং চারদিকে তাই নিয়ে কথাবার্তা চলছে। এ সময় আমাদের স্কুল বন্ধ করে দেয়া হয়। আমাদের উপরের শ্রেণীর ছাত্রদের বাংলা ভাষার পক্ষে স্লোগান দিতে শুনেছি, যা আমি খুব কমই হৃদয়ঙ্গম করতে পারতাম। ১৯৬২ সালে আমি যখন ঢাকা কলেজের ছাত্র, তখন ছাত্র রাজনীতির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠি। তখন শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে দেশে তোলপাড় চলছিল। আমরা রিপোর্টের বিরোধিতা করে ঢাকার রাস্তায় বিক্ষোভ করেছি, ফলে সরকার তা বাতিল করতে বাধ্য হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আমি ছাত্র রাজনীতির একজন কর্মী হয়ে যাই। তখনই ভাষা দিবসের গুরুত্ব আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। আমি বুঝতে পারি মাতৃভাষা রক্ষায় একুশের শহীদরা কীভাবে নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন। তখন থেকেই গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে আমি দিবসটি পালন করে আসছি। কখনও বন্ধুদের সঙ্গে, কখনও সতীর্থদের সঙ্গে, কখনও ব্যক্তিগতভাবে। বড় হয়ে আমি উপলব্ধি করলাম, একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর মধ্য দিয়ে আমাদের অস্তিত্ব সংরক্ষিত হয়েছে। সব গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় আন্দোলনে একুশে ফেব্রুয়ারি হয়ে উঠেছে আমাদের আশা ও উদ্দীপনার প্রদীপ। পরবর্তী সময়ে সব ধরনের অত্যাচার, অবিচার, বৈষম্য ইত্যাদির বিরুদ্ধে সংগ্রামে উদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে এ ভাষা আন্দোলন। একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনা এখন মাতৃভাষার পরিধি অতিক্রম করে সব পর্যায়ে মানবাধিকার বাস্তবায়ন করার একটি শক্তিশালী মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। মাতৃভাষা আন্দোলনের এ চেতনা থেকেই আমরা যে কোনো অবিচার ও মানবাধিকার লংঘনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার উদ্দীপনা পেয়েছি। এছাড়াও কোনো বৈধ দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সাধারণ মানুষ যখন সংগ্রাম করে, তখন তাদের মনোবল হিসেবে কাজ করে এ ভাষা আন্দোলনের চেতনা। প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাঙালিরা গভীরভাবে এর তাৎপর্য অনুভব করে এবং আবেগঘন দৃঢ়তায় দিবসটি পালন করে। তারা তাদের অস্তিত্বের নতুন অর্থ খুঁজে পায় এবং এক বছর পর আরও একটি একুশে ফেব্রুয়ারি আসার প্রতীক্ষা করে। এটাই হচ্ছে মাতৃভাষার শক্তি। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এর আগে দিবসটির সম্মানে একমাত্র সঠিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল, তা হচ্ছে এটিকে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলা। দিবসটিকে আরও বিশেষ কোনো মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়োজন ছিল। সে লক্ষ্যেই ছিল আমাদের প্রচেষ্টা। আমাদের সবার মিলিত প্রয়াসকে ধন্যবাদ যে, বিশ্ব এখন আমাদের মাতৃভাষা রক্ষা তথা মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার সংগ্রামকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য প্রাণ দিয়েছেন সালাম, জব্বার, রফিক, বরকত। এভাবে তারা এখন হয়ে গেছেন আমাদের জীবনের অংশ আর দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে আমরা হয়েছি ইতিহাসের অংশ। আমাদের প্রজন্ম এ নিয়ে গর্ব করতে পারে।গত সহস্রাব্দ শেষ হওয়ার আগেই আমাদের মাতৃভাষার দাবিতে আত্মাহুতিদানকারী শহীদের মিলেছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। অবশ্য এর আগে এমন অনেক আত্মত্যাগের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলেছে। কারণ সেগুলো ছিল উন্নত দেশগুলোর ঘটনা। আর মাতৃভাষার জন্য আমাদের সংগ্রাম ও ত্যাগের স্বীকৃতি মিলতে মিলতে পার হয়ে গেল ৪৭ বছরেরও বেশি সময়। যা হোক, তবুও আমরা তা পেয়েছি। সর্বোচ্চ অঙ্গীকার ও নিরলস সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে রক্ষা করেছি, স্বাধীনতা অর্জন করেছি এবং সর্বশেষে আমরা আমাদের মাতৃভাষা ও তার জন্য যে আত্মোৎসর্গ, তার স্বীকৃতি পেয়েছি। মনে হচ্ছে, আমরা নতুন সহগ্রাব্দটি দৃঢ়তার সঙ্গে এবং আরও বেশি প্রত্যাশাকে পুঁজি করে বেঁচে থাকার অধিকার অর্জন করেছি।
(ড. সা’দত হুসাইন : সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান)

মাতৃভাষা বাংলার চর্চা হোক সর্বত্র এবং সার্বজনীন
সৈয়দা গুলশান ফেরদৌস জানা

মাতৃভাষা হচ্ছে মানুষের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং কৃষ্টির পরিচয় জ্ঞাপক। সন্তানের জন্যে মায়ের অস্তিত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, মানুষের সুস্থভাবে প্রকাশিত হওয়ার জন্যে, বিকশিত হওয়ার জন্যে মাতৃভাষারও তেমনি বিকল্প নেই। বিশ্বজুড়ে সকল মাতৃভাষাই শ্রদ্ধার, ভালবাসার এবং সম্মানের। বাঙালির জীবনে মাতৃভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠায় যে অনন্য গৌরবময় ইতিহাস জড়িয়ে আছে, যে মূল্যবান আত্মত্যাগ মিশে আছে তা বোধকরি বিশ্বে আর কোথাও নেই। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে বাঙালির সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ একদিকে যেমন আমাদের মাতৃভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে তেমনি পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেরণা, অসীম শক্তি ও সাহসের সূচনা করে দিয়েছে, বাঙালিকে আত্মবিশ্বাসী, দৃঢ় আর সুসংবদ্ধ হতে উজ্জীবিত করেছে। মাতৃভাষার জন্যে এমন গৌরবমণ্ডিত আন্দোলন এবং অর্জনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বরে জাতিসংঘ ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। ভাষা, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি সম্পর্কিত বিষয়ে শ্রদ্ধা ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিনটি বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। আমাদের এই পাওয়া বড় মর্যাদাময় আত্মত্যাগের ফসল। আমাদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য মাতৃভাষা বাংলাকে যোগ্য মর্যাদার সাথে ব্যাপক চর্চা, সুষ্ঠু পরিচর্যা ও ঘরে-বাইরে সর্বত্র প্রচলন নিশ্চিত করা।শিশুর মুখে বোল ফোটে মায়ের কোলে, মায়ের ভাষাতেই। তাই যতেœর সাথে মাতৃভাষাটি শিশুর মনে এবং মস্তিষ্কে গেঁথে দেয়ার প্রথম দায়িত্বটি মায়েরই। মা-বাবা এবং পরিবারের অন্যদের সচেতনতায় একটি শিশু মাতৃভাষায় দক্ষ হয়ে ওঠে, নিজস্ব সংস্কৃতি, কৃষ্টি এবং সঠিক ইতিহাস বিষয়ে সম্যক ধারণা পায়। সত্যিকারের ব্যক্তিত্ব বিকাশ, দেশপ্রেম ও স্বদেশের প্রতি দায়বদ্ধতা শিখে বেড়ে ওঠে। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, এখন অনেক মা-বাবাই সন্তানের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের স্বপ্নে মাতৃভাষার পরিবর্তে ইংরেজি শিক্ষাকেই প্রাধান্য দেন এমন কি সঠিকভাবে বাংলা বলতে, পড়তে এবং লিখতে না পারা বা ইংরেজি বাংলার মিশ্রণে ইংরেজি কায়দায় কথা বলায় গৌরববোধ করে, উত্সাহিত করে। ফলে দু’টি ভাষার কোনটিই পরিপূর্ণভাবে শেখা হয়ে ওঠে না। এতে যে বড় ক্ষতিটা হয় তা হলো নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি অনীহা এবং মাতৃভাষার স্থলে আরোপিত এক বিচিত্র মিশ্র ভাষার চর্চার আগ্রাসন। ভাষা বিশ্বময় যোগাযোগের সেতু। মাতৃভাষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজি বা ভিন্ন ভিন্ন ভাষা শিক্ষা এবং পারদর্শিতা হাজারো সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। বিশ্বের সাথে যোগাযোগের পথ প্রসারিত হয়, মানুষ আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠে। তবে ভাষার ভিতটি হচ্ছে মাতৃভাষা। মানুষ তখনই ভিন্ন একটি ভাষায় পারদর্শিতা আনতে বিশেষভাবে সক্ষম হয় যখন সে তার মাতৃভাষাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে, মর্যাদার সাথে রপ্ত করে, চর্চা করে এবং পরিচর্যা করে। পৃথিবীর সপ্তম বৃহত্তম ভাষা হলো আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরাসহ বিশ্বজুড়ে পঁচিশ কোটিরও কিছু বেশি মানুষ বাংলায় কথা বলে। এর মধ্যে বাইশ কোটি মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হলেও বাকি তিন কোটি মানুষ কেবল ভালবেসে শিখে নিয়েই বাংলাকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে চর্চা করে। সেখানে বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা হওয়া সত্ত্বেও এমন অবজ্ঞা কেন! অবহেলা কেন! পাঁচ পাঁচটি যুগ পেরিয়ে যাবার পরেও আমরা মাতৃভাষা বাংলাকে সেই যোগ্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি! এ বড় পরিতাপের বিষয়। আমাদের সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত হওয়া উচিত। পারিবারিক এবং সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় জোরালো উদ্যোগে আমাদের সেই ১৯৫২’র আবেগ, দেশপ্রেম, আত্মমর্যাদাবোধ আর শহীদের রক্তে রাঙা ২১ ফেব্রুয়ারির প্রতি সত্যিকারের ভালবাসা, শ্রদ্ধাবোধ অক্ষুণœ রাখা সম্ভব। গৌরবমণ্ডিত মাতৃভাষা বাংলার জন্যে ভাষাশহীদ এবং ভাষাসৈনিকদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতা।
(লেখক : পরিচালক, সামহোয়্যার ইন ব্লগ)

ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ

১৯৫২ সালে আমি চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। আমার গ্রামের বাড়ি থেকে এক মাইল দূরে একটি হাইস্কুল। নাম খোর্দকোমরপুর হাইস্কুল। এর সঙ্গে প্রাইমারি শাখা ছিল। ১৯৫২-এর ফেব্রুয়ারি মাসের ২২/২৩ তারিখ হবে হয়তো। সিনিয়র ক্লাসের ছেলেরা এসে বলল ক্লাস হবে না। ঢাকায় পুলিশ ছাত্রদের গুলি করে মেরে ফেলেছে। মিছিল করতে হবে। ঘটনার গুরুত্ব যে বুঝেছি তা বলব না। তবে সবাই মহাআনন্দে মিছিলে যোগ দিয়ে গ্রাম প্রদক্ষিণ করলাম। মিছিলের দুটো স্লোগান খুব ভালোভাবে মনে ছিল ১. রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই ২. নুরুল আমিনের কাল্লা (মাথা) চাই। তখন নুরুল আমিন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সহযোগী। ১৯৭১-এর গণহত্যার খলনায়ক ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়ার মন্ত্রিসভার ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি বাংলাদেশে ফেরেননি। পাকিস্তানে মৃত্যুবরণ করেছেন। ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার দাবিতে ছাত্রদের গুলি করে বাংলা ও বাঙালি বিদ্বেষের যে পরিচয় তিনি দিয়েছিলেন তার সেই ‘আদর্শের’ প্রতি তিনি আমৃত্যু নিষ্ঠাবান ছিলেন। ফিরে আসি গ্রামের মিছিলের প্রসঙ্গে। সেদিন হাটবার, স্থানীয় হাট বসার কথা। ছাত্ররা হাটে আগমনকারী সবাইকে আহ্বান জানালেন হাটে না বসার জন্য। তারা কোনো প্রতিবাদ না জানিয়ে বরঞ্চ পরোক্ষ সমর্থন জানিয়ে ফিরে গেলেন। বেশ কয়েকদিন এই মিছিল চলেছিল। আমাদের গ্রামের নাম মিনিকপাড়া। গাইবান্ধা মহকুমা শহর (বর্তমানে জেলা) থেকে ১০ মাইল দূরে। যোগাযোগ বলতে কাঁচা সড়ক। গরুর গাড়ি এবং সাইকেল ছাড়া আর কোনো বাহন ছিল না। এহেন নিভৃত পল্লীতে যখন ভাষা আন্দোলনের জোয়ারের ঢেউ আঘাত হেনেছিল তখন নিশ্চিত করে বলা যায় গোটা দেশ এই আন্দোলনে আলোড়িত হয়েছিল- এক কথায় বলা চলে সর্বস্তরের জনগণ এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছিল।
ভাষা আন্দোলনের পটভূমি প্রথমে আলোচনা করা দরকার। যখন পাকিস্তানের জন্ম অবধারিত হলো অর্থাৎ ব্রিটিশরা সিদ্ধান্ত নিল যে, ভারতকে ভাগ করে মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান এবং বাকি জাতির জন্য ভারত- এই দুই দেশের ওপর দায়িত্বভার বুঝিয়ে দেবে, তখন অর্থাৎ ১৯৪৬-৪৭ সালে একদল বেকুব বুদ্ধিজীবী গবেষণা শুরু করলেন যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, এর নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. জিয়াউদ্দীন। সম্মানিত পাঠক, বেকুব এ কথাটা এ জন্য বলছি যে, রাষ্ট্রের জনগণ যে ভাষার কথা বলে সেটা তার মাতৃভাষা তথা রাষ্ট্রভাষা। তবে প্রয়োজনবোধে একাধিক রাষ্ট্রভাষা হতে পারে কিন্তু মাতৃভাষার বিনিময়ে নয়। যাহোক ড. জিয়াউদ্দীন গং রায় দিলেন যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হতে হবে উর্দু। অথচ পূর্ব বাংলা তো নয়, এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশের কোনোটিতে উর্দু মাতৃভাষা ছিল না। জ্ঞানতাপস ড. শহীদুল্লাহ অবশ্য এর প্রতিবাদ জানিয়ে নিবন্ধ লিখে বলেছিলেন যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ ভাগ আমরা বাঙালি। শেষ পর্যন্ত আমাদের মুখের ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে তরুণদের বুকের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করতে হয়েছিল। পৃথিবীতে এটি যেমন অনন্য সাধারণ ঘটনা যে নিজের মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিতে হয়েছে, তেমনি ‘অনন্য অসাধারণ’ ঘটনা যে, তৎকালীন গণপরিষদে বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও বাংলা ভাষার জন্য প্রস্তাব করা হয়নি। ধিক সেই সংসদকে, ধিক সেই সদস্যদের। এটা আবেগের কথা নয়, ইতিহাস দাবি করে তাদের ধিক্কার জানাতে হবে। ১৯৪৮ সালে করাচিতে যখন গণপরিষদের অধিবেশন চলছিল, তখন ইংরেজি এবং উর্দুতে পরিষদের কর্মসূচি দেখে পূর্ব বাংলার সদস্য শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত একটি প্রস্তাব আনলেন যে, উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও স্বীকৃতি দেয়া হোক। এ প্রস্তাবটি তিনি এনেছিলেন ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। সে সময় গণপরিষদের মোট সদস্য সংখ্যা ৭৪। এর ভেতর পূর্ব পাকিস্তানের সদস্য ছিল ৪৪। অতএব বাংলার অনুকূলে প্রস্তাব নেয়ার কোনো বাধা থাকার কথা নয়। অথচ কী লজ্জার কথা যে, প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়। সমস্যাটা কোথায় ছিল? প্রথমত, বাংলার মুসলমানরা পরিচয় সংকটে ভুগছিলেন। একই সঙ্গে বাঙালি এবং মুসলমান থাকা যায়, এটা অনেকের মাথায় হয়তো ঢুকেনি। তাছাড়া কয়েকজন সদস্য যেমন খাজা নাজিমুদ্দীন, ফজলুর রহমান, এরা মনেপ্রাণে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি বিরোধী। এদের সম্পর্কে বোধহয় সতের শতাব্দীর বাঙালি মুসলমান কবি আব্দুল হাকিমের কথা প্রযোজ্য। তিনি বলেছেন, ‘যেসব বংগেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’। তৎকালীন মুসলমান রাজনীতিকরা যদি এটুকু বুঝতেন যে, বাংলা ভাষার উন্নতি শুধু হিন্দু দিয়ে হয়নি; বাংলার লোকগীতিতে উভয় সম্প্রদায়ের অবদান রয়েছে; কবি নজরুল, শেখ ফজলুল করিম, মীর মশাররফ হোসেন এদের অসাধারণ অবদান বাংলা ভাষায়; এখন পর্যন্ত বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ এলিজি বা শোকগাথা, কবি জসীমউদ্দীনের- তাহলে তারা হয়তো বিভ্রান্ত হয়ে এই অপকর্মটি করতেন না। গণপরিষদে বাংলার পক্ষে প্রস্তাব গৃহীত না হওয়ায় জনাব মোহম্মদ আলী জিন্নাহ আরো বেশি উৎসাহবোধ করেছেন একমাত্র উর্দুর রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা দেয়ার। জনাব জিন্নাহ একই বছরের ২১ মার্চে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন একমাত্র উর্দু, উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। উভয় স্থানে বঙ্গবন্ধুসহ তরুণ ছাত্রনেতারা না না বলে প্রতিবাদ করেছিলেন। সে সময় জিন্নাহর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। তাই হয়তো প্রতিবাদ যতটা তীব্র হওয়ার কথা তা হয়নি। তবে প্রতিবাদ তো হয়েছিল। জনাব জিন্নাহ অসম্ভব ক্ষমতালোভী ছিলেন। তিনি একই সঙ্গে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল, নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট এবং গণপরিষদের প্রেসিডেন্টের পদ আঁকড়ে ধরেছিলেন। এতে বোঝা যায় যে, আর যাই হোক না কেন তিনি গণতন্ত্রমনা ছিলেন না। তাহলে ভাষার বিষয়টা এভাবে চাপিয়ে দিতেন না। ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ সাহেবের এরকম কথার পর বাংলার ছাত্রসমাজ আরো সচেতন হয়ে উঠলেন। তারা বুঝতে পারলেন যে, বিষয়টি নিয়ে সংগ্রাম করতে হবে। ১৯৫০ সালের ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এর আহ্বায়ক ছিলেন আব্দুল মতিন। তিনি ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িত ছিলেন যে, তিনি এখন ‘ভাষা মতিন’ নামে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে খ্যাত। ১৯৫২ সালের শুরু থেকে ভাষা আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিতে থাকে। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন করাচি থেকে ঢাকায় আসেন। তিনি পল্টন ময়দানে এক জনসভায় বলেন যে, প্রদেশের সরকারি কাজকর্মে কোন ভাষা ব্যবহৃত হবে তা প্রদেশের জনগণই ঠিক করবে। কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে কেবল উর্দু। সঙ্গে সঙ্গে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। ৩১ জানুয়ারি ১৯৫২তে আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধিদের সভায় ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীর রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয় যার আহ্বায়ক হন কাজী গোলাম মাহবুব। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল, জনসভা ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়। সরকার এসব নিষিদ্ধ করে সমগ্র ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে। ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ আলোচনা সভায় বসে। কিন্তু অধিকাংশ সদস্য ১৪৪ ধারা জারিতে আতঙ্কিত হয়ে এটি না ভঙ্গ করার পক্ষে মত দেন। তখন ছাত্রনেতারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেন। এতে ছিলেন আব্দুল মতিন, গাজীউল হক, অলি আহাদসহ আরো অনেকে। পরদিন অর্থাৎ ২১ জানুয়ারি ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করার চেষ্টা করলে পুলিশ গুলি চালায়। শহীদ হন বরকত, সালাম, রফিক, শফিক এবং আরো অনেকে। তাদের এ আত্মত্যাগ ভাষা আন্দোলনকে আরো বলীয়ান করে তোলে। গোটা প্রদেশের মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ১৯৫৩ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত হয়েছে শহীদ দিবস হিসেবে। তখন কালো ব্যাজ ধারণ করা হতো এই দিনে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাক হানাদার বাহিনী আক্রমণের প্রথম প্রহরে ট্যাংকের গোলা দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল শহীদ মিনার। কেননা তারা জানত যে, এই শহীদ মিনার বাঙালির সংগ্রামের প্রেরণার উৎস। তাই তারা ইট-সিমেন্টের নির্মিত মিনারটি দেখে আতঙ্কিত হয়েছিল। স্বাধীনতার পর শহীদ দিবস নতুন মাত্রা পেল। শহীদদের জন্য আমরা শোকাহত হই কিন্তু তারচেয়ে বেশি গর্ববোধ করি। সর্বস্তরের জনতা শহীদ মিনারে গিয়ে নতুন করে শপথ গ্রহণ করে, পায় নতুন প্রেরণা। আজ এটি মহাজাতীয় অনুষ্ঠান। ভাষা আন্দোলন শুধু রাষ্ট্রভাষার দাবি ছিল না। এটি বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম সোপান। এর মাধ্যমেই পাকিস্তান সম্পর্কে মোহ কেটে যায়। বাঙালিরা উপলব্ধি করে যে, তারা এক সাম্রাজ্যবাদের শাসন থেকে মুক্ত হয়ে আরো নিম্নমানের ঔপনিবেশিকদের খপ্পরে পড়েছে। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে তারা যুক্তফ্রন্টকে ভোট দেয়, যারা ২১ দফাকে নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো হিসেবে উপস্থাপিত করেছিল। যুক্তফ্রন্ট ২৩৭টি মুসলিম আসনের ভেতর ২২৮টি আসনে জয়লাভ করে। কিন্তু বাঙালির দুর্ভাগ্য যে, যুক্তফ্রন্ট ঐক্য ধরে রেখে বাংলার মুক্তির জন্য কাজ করতে ব্যর্থ হয়। নিজেদের মধ্যে বিভাজন এবং কলহ বাঙালির স্বপ্নকে চুরমার করে দেয়। এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৯৭ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। এরপর থেকে অর্থাৎ ১৯৯৮ সাল থেকে এই দিবসটি বিশ্বব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। ইউনেস্কোর সিদ্ধান্তের ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনকে একটি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সাফল্যের পেছনে অনেক ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেমন ‘তমদ্দুন মজলিশ’ নামে তৎকালীন একটি প্রতিষ্ঠানেরও বেশ অবদান রয়েছে। এই স্বল্প পরিসরে সবার নাম উল্লেখ করা সম্ভব নয়। তাছাড়া এই কলামে ভিন্ন কিছু বক্তব্য উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। যেটি বর্তমান বাংলা একাডেমির মূল ভবন, এটি সে সময় ‘বর্ধমান হাউস’ নামে পরিচিত ছিল। ছাত্রহন্তা মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন এই বাড়িতে থাকতেন। তখন এটি ছিল মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাস ভবন। যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার একটি দফায় বলা হয়েছিল যে, এই ভবনটিতে বাংলা ভাষার চর্চা এবং উৎকর্ষের জন্য বাংলা একাডেমি স্থাপন করা হবে। যেটি বাস্তবায়িত হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি ভবন নতুনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। তবে যে আদর্শ এবং উদ্দেশ্য নিয়ে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে দিকটায় তেমন সাফল্য আসছে না। যেমন সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করা। এখনকার বাংলা একাডেমি রুটিনমাফিক কাজ করে চলেছে। এর অবশ্য অন্যতম প্রধান কারণ যে বাংলা একাডেমি অতিমাত্রায় সরকারি নিয়ন্ত্রণে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তখন তাদের দলীয় পছন্দ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে। ফলে অনেক সময় দেশের খ্যাতনামা কবি-সাহিত্যিকের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না এবং পুরস্কার দেয়ার ব্যাপারেও সেই দুঃখজনক মানসিকতার প্রতিফলন ঘটে। আর সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করার ব্যাপারে বাংলা একাডেমির পক্ষে নিজস্ব কোনো উদ্যোগ নেয়া কঠিন, কেননা এ ব্যাপারে সরকারের কোনো আন্তরিকতা নেই। ২১ ফেব্রুয়ারিকে বাৎসরিক মহানুষ্ঠানে আবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। সেদিন যে পরিমাণ পুষ্পার্ঘ্য দেয়া হয়, তা ওজন করলে দেখা যাবে যে, কয়েকশ টন হয়েছে। বেশ কয়েকটি এফএম ব্যান্ডের রেডিওর অনুমতি দেয়া হয়েছে। সেসব শুনলে দেখা যাবে যে, ইংরেজি-বাংলার জগাখিচুড়ি। সেখানে তারা ফ্যাশন করে উচ্চারণ করতে গিয়ে ‘র’-এর উচ্চারণ ‘ড়’ করে ফেলছে- এরকম আরো অনেক বিকৃতি ঘটানো চলছে। তবে এত কিছুর পরও জাতি চিরকাল ২১ ফেব্রুয়ারিকে স্মরণ করবে একটি মহাদিবস হিসেবে, কেননা এদিন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার রাষ্ট্রীয় চক্রান্তকে বুকের রক্ত দিয়ে তরুণরা প্রতিহত করে। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের যাত্রা শুরু এই ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। ভাষা শহীদসহ সব শহীদকে স্মরণ করি।
(সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ : সাবেক ইপিসিএস ও কলাম লেখক।)

ভালোবাসার অপরাধে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে ফাঁসিতে ঝুলতে হয় ১৪ ফেব্রুয়ারী: সেই থেকে  বিশ্ব ভালোবাসা দিবস

Matiar Chowdhury

মতিয়ার চৌধুরী

আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। দিনটি শুধুই ভালোবাসার, হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের গভীর সম্পর্কের। কারণ ভালোবাসার অর্থ যে গভীর দ্যোতনাময়। সখী ভালোবাসা কারে কয়- বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এভাবেই ভালোবাসার অর্থ খুঁজেছিলেন।  প্রিয় মানুষটিকে আরো বেশি কাছে পাওয়ার, আরো বেশি ভালোবাসার জানার ও বোঝার দিন। প্রেমিক-প্রেমিকারা মন খুলে বলবে তাদের হৃদয়ের কথা।

ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে’। প্রেমপিয়াসী হৃদয়ের কাছে বিশেষ গুরুত্ব আছে এ দিনটির। বছরের এ দিনকে সারা বিশ্বের তরুণ-তরুণীরা বেছে নিয়েছে হৃদয়ের ব্যাকুল কথার কলি ফোটাতে। তরুণ-তরুণী শুধু নয়, নানা বয়সের মানুষের ভালোবাসার বহুমাত্রিক রূপ প্রকাশ করার আনুষ্ঠানিক দিন আজ। এ ভালোবাসা যেমন মা-বাবার প্রতি সন্তানের, তেমনি মানুষে-মানুষে ভালোবাসাবাসির দিনও এটি। আমি বলি সারা বছর, সারা দিন ভালোবাসার। তবে আজকের এ দিনটি ভালোবাসা দিবস হিসেবে বেছে নিয়েছে মানুষ।’ বাংলাদেশে ভালোবাসা দিবস পালনের রীতি খুব বেশি দিনের নয়। মূলত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে দিবসটি ঘিরে উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়।

বসন্তের প্রথম দিন গেল গতকাল, আজ ভালোবাসার দিন। দুটি দিনই তাদের মধ্যে আনন্দের, উৎসবের। শুধু তারুণ্যই নয়, প্রৌঢ় থেকে শুরু করে শিশু, কিশোর, মধ্যবয়সীদের মধ্যে ছড়িড়ে পড়ে এর আবহ। বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইন ডে পালনের রীতিটা মূলত ইউরোপীয় ঘরানার। আমাদের বাঙালি সমাজে এই রীতিটা প্রবেশ করেছে এক যুগ হয়।এরও বহু আগে এ দিবস পালনের সূচনা হয়। তবে বাঙালি সংস্কৃতিতে বসন্ত উৎসব সেই অনাদিকাল থেকেই যাপিত হচ্ছে। সনাতন ধর্মাচারীরা দোলযাত্রা, বাসন্তী পূজা, হোলি উৎসবে প্রণয়কে মুখ্য করে রেখেছিল, তরুণ-তরুণীর ভালোবাসাকে আপন করেছিল। আর এখন ভ্যালেন্টাইন ডে বাংলাদেশ সহ বিশ্বব্যাপী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে রূপ পায় এক মহোৎসবের।স্মৃতির পাতায় ভালোবাসার দিবস: ভালোবাসার গল্পটি শুরু হয়েছিল সেই ২৬৯ খ্রিস্টাব্দে। রোমের চিকিৎসক তরুণ যাজক সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের চিকিৎসায় দৃষ্টি ফিরে পেয়েছিল নগর জেলারের দুহিতা। পরে দুজনের মধ্যে মন দেয়া-নেয়া হয়। সেই থেকে জন্ম নিয়েছিল তাদের ভালবাসার অমরগাঁথা। ভালবাসার অপরাধে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে ফাঁসিতে ঝুলতে হয় ফেব্রুয়ারির এই ১৪ তারিখে। তারপর এই ভালোবাসার স্বীকৃতি পেতে দুই শতাব্দী নীরবে-নিভৃতে পালন করতে হয়েছে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে। ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে রোমের রাজা পপ জেলুসিয়াস এই দিনটিকে ভ্যালেন্টাইন দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। গ্রিক ও রোমান উপকথার মতই ভালোবাসা দিবসের উৎপত্তি নিয়ে আরো গল্প-কাহিনী ছড়িয়ে আছে বিশ্বময়। কে এই ভ্যালেন্টাইন তাও রহস্যাবৃত।

ক্যাথলিক এনসাইক্লোপিডিয়া অনুসারে তিনজন সেন্ট ভ্যালেন্টাইন বা ভ্যালেন্টিনাসের সন্ধান পাওয়া যায়। তারা সবাই ১৪ ফেব্রুয়ারিতে আত্মদান করেন। দেশে দেশে ভালোবাসা দিবস: উনিশ শতকেই উত্তর আমেরিকায় ভ্যালেন্টাইন ডে পালিত হয় ব্রিটিশ অভিবাসীদের মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক হারে ভ্যালেন্টাইন কার্ড বিনিময় শুরু হয় ১৮৪৭ সালে ম্যাসাসুয়েটসের অরকেস্টারে। ইতিহাসবিদদের ভাষায়, দুটি প্রাচীন রোমান প্রথা থেকে এই উৎসবের সূত্রপাত।চীনে ভালোবাসা প্রকাশের সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। ভ্যালেন্টাইন ডে পালনের আগে তারা বছরের দুই দিন পালন করতো ভালোবাসা দিবস। এখন তো চীনে ব্যাপক হারে দিবসটি পালিত হয়। পশ্চিমা ধাঁচে ১৪ ফেব্রুয়ারিই তারা ভালোবাসা দিবস পালন করে।ইউরোপের সব দেশেই মহাসমারোহে তরুণ-তরুণীরা এ দিবস পালন করে। মার্কিনিদের মধ্যে ভ্যালেন্টাইন ডে পালনের হার বেশি। জরিপে দেখা গেছে, চার মার্কিনির মধ্যে তিনজনই দিবসটি পালন করে। আমেরিকায় এ দিনে ১৬ কোটি কার্ড, ১৩ কোটি গোলাপ বিনিময় হয়। ভারতেও ভালোবাসা দিবস পালিত হয় উৎসবের আমেজে। তবে আমাদের দেশের মতো ভারতেও তরুণ-তরুণীরা এ দিবস পালন করে বেশি।

ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও বাংলাদেশ

এম এন করিম

প্রতিটি দেশেরই রয়েছে সম্ভাবনা, তবে সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন সঠিক নেতৃত্ব। সকল ক্ষেত্রে সঠিক নেতৃত্ব একটি দেশের উন্নয়নে রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সঠিক নেতৃত্ব একটি দেশের শ্রেষ্ঠ চালিকা শক্তি ও উন্নয়নের পূর্বশর্ত। এর দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে অনেক আছে। যেমন, গত দু’দশকে ভারত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও চীন সফলতার শীর্ষে। এর কারণ একটাই, সঠিক নেতৃত্ব। স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের দেশে নিঃস্বার্থ নেতৃত্বের অভাবটাই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। এ কারণে আমাদের দেশ ক্রমশ পরিণত হয়েছে দুর্নীতির অভয়ারণ্যে। যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই দেখা যায়, দুর্নীতি ও অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা। ফলে সম্পদ ও সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত মানে উন্নীত হতে পারেনি আমাদের দেশ। এই নেতৃত্ব তৈরির জন্য বিভিন্ন সংগঠন নিয়মিত আয়োজন করে যাচ্ছে ‘ইয়থ লিডারশীপ’ শিরোনামে বিভিন্ন ওয়ার্কশপ, সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম। কিন্তু এর বাস্তবতা দৃশ্যমান যেন অমাবস্যার চাঁদের রূপ লাভ করেছে। বার বার প্রমাণিত হচ্ছে, পুঁথিগত বিদ্যা দিয়ে নেতৃত্ব তৈরি সম্ভব নয়, নেতৃত্ব হলো চর্চার বিষয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নেতৃত্ব তৈরির জায়গা দুটি। ছাত্র সংসদ ও ছাত্র রাজনীতি। বর্তমানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণতন্ত্রের চর্চা শুরুর জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতা নির্বাচন শুরু করলেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তা আজ উপেক্ষিত। নির্দিষ্ট সময় শেষে একটি সনদপত্র প্রাপ্তিই উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য নয়। উচ্চশিক্ষা পূর্ণ করার জন্য প্রয়োজন আরো কিছু অনুষঙ্গের। যা একটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মানবিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক গুণের বিকাশ ঘটায়। এ গুণগুলোর অধিকাংশ পূরণ করে থাকে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ। এটাকে বলা হয় নেতৃত্ব তৈরির কারখানা। এখান থেকে শুরু হয় গণতন্ত্রের সুষ্ঠু চর্চা। এটি একটি অরাজনৈতিক ব্যানার। এখান থেকে শে¬াগান উঠবে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের, মিথ্যাকে দূরীভূত করার ও সত্য প্রতিষ্ঠিত করার। সর্বোপরি, সমৃদ্ধ দেশ গড়ার। বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিন বঞ্চিত করা হচ্ছে এই মৌলিক অধিকার থেকে। এর জন্য কারণ হিসেবে আঙুল তোলা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের দুর্নীতি ও অনিয়মের দিকে। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ চালু থাকলেও বন্ধ রয়েছে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন বন্ধ রয়েছে প্রায় ২৩ বছর। এছাড়াও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চকসু) ২২ বছর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) ২৪ বছর ও জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) ২৪ বছর নির্বাচন বন্ধ রয়েছে। অর্থাত্ সবগুলো বর্তমানে অকার্যকর। এরশাদের আমলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলেও গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে বন্ধ রয়েছে এই নির্বাচন। ফলে বিকশিত হতে পারছে না সুপ্ত নেতৃত্ব। নেতৃত্ব তৈরির অন্য ক্ষেত্র- ছাত্র রাজনীতি। ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন ও স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেও আজকে যেন তারা ছিটকে পড়ছে তাদের আদর্শের বা বৈশিষ্ট্যের কক্ষপথ থেকে। স্বাধীনতার পর ছাত্র সংগঠনের সংখ্যা বাড়লেও বাড়ছে না যোগ্য নেতৃত্ব। বরং বাড়ছে কোন্দল, হত্যা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভর্তি বাণিজ্য ও শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনা। আরো বাড়ছে ইভটিজিং, মাদক ও অস্ত্রের ঝনঝনানি। এদের অপকর্মের নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে মূল দল ও স্থানীয় প্রশাসন। এরা পদের জন্য নিজ দলের কর্মীকে হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না। এদের কাছে দূরবিন দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না ফোর্বস সাময়িকীতে উলি¬খিত ১০টি নেতৃত্বের ন্যূনতম গুণাবলি। ফোর্বস সাময়িকীর মতে নেতৃত্বের দশটি গুণাবলী হলো- ১. ঐড়হবংঃ, ২. উবষবমধঃব, ৩. ঈড়সসঁহরপধঃরড়হ, ৪. ঈড়হভরফবহপব, ৫. ঈড়সসরঃসবহঃ, ৬. চড়ংরঃরাব ষধঃরঃঁফব, ৭. ঈৎবধঃরারঃু, ৮. ওহঃঁরঃরড়হ, ৯. ওহংঢ়রৎব এবং ১০. অঢ়ঢ়ৎড়ধপয. এদের নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে কর্মের চেয়ে জন্মকে। আজ প্রতিযোগিতাকে বাদ দিয়ে বেছে নেওয়া হচ্ছে প্রতিপক্ষকে। এরা কলমের পরিবর্তে হাতে নিয়েছে অস্ত্রকে। তাই আজ মশাল যাচ্ছে অন্ধের হাতে। ফলে সে পথ না দেখিয়ে আগুন দিচ্ছে মানুষের ঘর-বাড়িতে, নিজের অজান্তে। আর সাধারণ ছাত্রসমাজ আজ ঘৃণা করছে ছাত্র রাজনীতিকে। সুশৃংখল ছাত্র-রাজনীতি ও ছাত্র-সংসদ নির্বাচন-চর্চা আর পরিবারতন্ত্র থেকে বের হতে পারলেই বাংলাদেশেও জন্ম নেবে আব্রাহাম লিংকন, মহাত্মা গান্ধী, মাহাথির মোহাম্মদ, নেলসন ম্যান্ডেলা ও লি কুয়ান ইউর মতো নেতৃবৃন্দ। আর দেশ এগিয়ে যাবে উন্নতির শিখরে।
লেখক : শিক্ষার্থী, ফলিত গণিত বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল : প্রশংসার দাবীদার শেখ হাসিনা

প্রফেসর ড. আবদুল খালেক

বাংলাদেশ বর্তমানে ১৬ কোটি মানুষের একটি দেশ। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশ থেকে মন্তব্য করা হয়েছিল বাংলাদেশ খাদ্য ঘাটতিতে পড়বে। কিন্তু তাদের মন্তব্য মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ফান্ড নিয়েও দেশে বিদেশে যে নেতিবাচক বক্তব্য দেয়া হয়েছিল, সে সব বক্তব্য আজ তাদেরকে প্রত্যাহার করে নিতে হচ্ছে। বর্তমান সরকার থেকে যখন দাবি করা হচ্ছিল বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে একটি মধ্য আয়ের দেশ বলে স্বীকৃতি পাবে, তাদের সে দাবিকেও অনেকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, বিরূপ সমালোচনাকারীদের সুর খানিকটা নরম হয়ে আসছে। বাস্তব সত্যকে অস্বীকার করবার মত মনের জোর আর তাদের থাকছে না। দেশে সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদের যে উত্থান ঘটতে শুরু করেছিল, বর্তমান সরকার সে জঙ্গিবাদের উত্থানকে অত্যন্ত সাফল্যের সাথে থামিয়ে দিতে সমর্থ হয়েছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতাও দিন দিন কমে আসছে। বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো উত্থাপন করছে, দেশের আপামর মানুষের কাছে তা মোটেই গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না। যে কারণে পৌরসভা নির্বাচন অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হতে পেরেছে। এসব ঘটনা দেশের মানুষকে ক্রমেই আত্মপ্রত্যয়ী করে তুলছে। সরকারের সাহসী পদক্ষেপের কারণে একদিকে যেমন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে, অপরদিকে নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মত একটি বিশাল সেতু নির্মাণ কাজ দ্রুত সমাপ্তির দিকে এগিয়ে চলেছে। দেশের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পেরেছেন বলেই দেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হতে শুরু করেছে। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার কারণেই এমনি ঘটছে। সমগ্র পৃথিবী আজ অবাক বিস্ময়ে বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছে। ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এক সময় তাদের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ লাভ করেছিল। এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে যদি শেখ হাসিনা কঠোর হস্তে দমন করতে না পারতেন, সে ক্ষেত্রে শুধু ভারতীয় উপমহাদেশ নয়, সমগ্র বিশ্বশান্তি মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়তো।

Sheikh_Hasinaবিএনপি নেতাদের মুখে মাঝে মাঝে উচ্চারিত হয়, দেশের মানুষ ভালো নেই, দেশ থেকে গণতন্ত্র নির্বাসিত হয়েছে, আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে হটাতে হবে, সরকারের দিন ফুরিয়ে গেছে ইত্যাদি। বিএনপি নেতাদের এসব কথা দেশের মানুষের কাছে কোনো রকম গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। বরং দেশের মানুষ মনে করে বর্তমান সরকারের শাসনকালে দেশের সাধারণ মানুষ ভালো আছে বরং সন্ত্রাসীরা ভালো নেই। জামায়াত-বিএনপি একজোট হয়ে গণতন্ত্র উদ্ধারের নামে পেট্রোল বোমা হামলার মাধ্যমে যে ভাবে মানুষকে পুড়িয়ে মারছিল, রেল লাইন উপড়ে ফেলে ট্রেন লাইনচ্যুত করে পথচারীদেরকে হত্যার যে পথ বেছে নিয়েছিল, দেশের মানুষের কাছে আজ স্পষ্ট হয়েছে শুধু জামায়াত নয় বিএনপিও সন্ত্রাসী দল হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। সরকারের কঠোর শাসনে সেই সন্ত্রাসী জোট যে আজ মোটেই ভাল নেই, দিন দিন তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বাংলাদেশের মানুষ মোটেই পছন্দ করে না। যে কারণে জামায়াত-বিএনপির সরকার বিরোধী আন্দোলনের ডাকে দেশবাসীর কাছ থেকে কোনে রকমা ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। জামায়াত এবং বিএনপি আজ সম্পূর্ণ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয় সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ধারণা করা যাচ্ছে রাজনৈতিকভাবে জামায়াত-বিএনপি জোট দেউলিয়া বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।দেশে একটি শুভবুদ্ধিসম্পন্ন বিরোধী দল থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমানে তেমন বিরোধী দল প্রায় অনুপস্থিত। জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ না করলে বিএনপিকে দেশবাসী গ্রহণ করবে না, এমন বার্তা বিগত পৌরসভার নির্বাচনে দেশের বিবেকবান ভোটারগণ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে। এই বার্তা যদি বিএনপি বুঝতে না পারে, দলটির কপালে অনেক দুঃখ আছে। বিএনপির এই ভগ্নদশায় মনে করা হয়েছিল জাতীয় পার্টি একটি সুবিধাজনক স্থান দখল করে নেবে। কিন্তু জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ যে খামখেয়ালীপনা শুরু করেছেন, তাতে জাতীয় পার্টির অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। বিগত পৌরসভার নির্বাচনী ফলাফল বলে দিয়েছে এরশাদ সাহেবের নেতৃত্ব সম্পূর্ণ ব্যর্থ এবং অগ্রহণযোগ্য। কাজেই বলা যায় বাংলাদেশে বর্তমানে বিরোধী দল বলে আর কিছু নেই। এই শূন্যতা গণতন্ত্রের জন্য কাম্য নয়। বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁরা অন্ধ হয়ে গেলেও প্রলয় কিন্তু বন্ধ থাকবে না। প্রলয়কে মোকাবিলা করবার মত শক্তি যদি তাঁদের না থাকে, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে তাঁরা হারিয়ে যেতে পারেন।
আগের তুলনায় আওয়ামী লীগের প্রতি দেশের মানুষের আস্থা যে বৃদ্ধি পেয়েছে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনী ফলাফলে তা স্পষ্ট হয়ে গেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় রূপন্ত—রিত করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ঘাতকেরা তাঁকে সে সময় দেয়নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তারিখে বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবার-পরিজনকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। শুধু তাই নয় ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরে বঙ্গবন্ধুর চারজন ঘনিষ্ঠ অনুসারী জাতীয় নেতাকে জেলখানার অভ্যন্তরে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। খুনীদের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে পাকিস্তানের কাছে ফিরিয়ে দেয়া, উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে একটি ভিখারি রাষ্ট্রে পরিণত করা। তবে আশার কথা খুনীদের স্বপ্ন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে গেছে। শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ সত্যিকার অর্থে সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হতে চলেছে। এর শতভাগ কৃতিত্ব বলা যেতে পারে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধ-কন্যা শেখ হাসিনার। শুধু বাংলাদেশে নয়, সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সন্ত্রাস দমনের লক্ষ্যে শেখ হাসিনার পদক্ষেপ কতটা সফলতা লাভ করেছে, ফলপ্রসূ হয়েছে, আজ তা মূল্যায়নের সময় এসেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করছে, এর কৃতিত্ব অনেকটাই শেখ হাসিনার প্রাপ্য।শেখ হাসিনা একজন অসাধারণ রাষ্ট্রনায়ক, একথা যেমন সত্য, তার চেয়ে বড় সত্য শেখ হাসিনার মত সহজ, সরল, নিরহঙ্কার, মানবদরদী খোলা মনের রাষ্ট্রনায়ক বর্তমান পৃথিবীতে খুবই দুর্লভ। এর কিছু কারণ উদাহরণ হিসেবে বিশে¬ষণ করা যেতে পারে। দেশের যাঁরা প্রধানমন্ত্রী হন, তাঁদেরকে কিছু প্রটোকল মেনে চলতে হয়। তাঁদের জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবেই এসব প্রটোকল ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু যে সমস্ত নেতা দেশের মানুষকে অধিক পরিমাণ ভালোবাসেন, তাঁদের পক্ষে দেশের প্রচলিত প্রটোকল মেনে চলা কঠিন কাজ। যেমন বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ্য করেছি। বঙ্গবন্ধু অনেক সময় প্রটোকল ভেঙে সাধারণ মানুষের কাছে চলে যেতেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাও মাঝে মাঝে বাবার পথ অনুসরণ করে চলেছেন। এ বিষয়ে কিছু উদাহরণ তুলে ধরছি- গত ১৮ জানুয়ারি তারিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বাসায় একটি পিঠা উত্সবের আয়োজন করেছিলেন। আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন দেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী এবং সাংবাদিকবৃন্দ। শীতকালে পিঠা খেতে গ্রাম বাংলার মানুষ ভালোবাসে। শেখ হাসিনা ছোটবেলায় দাদা-দাদীর বাড়িতে গ্রামের মানুষদের পিঠা প্রীতি খুব কাছ থেকে দেখবার সুযোগ পেয়েছিলেন। গ্রামের সেই দিনগুলোর স্মৃতি এখনও তিনি ভুলে যেতে পারেননি। ছোটবেলার সেই দিনগুলো ফিরিয়ে আনতেই যেন গণভবনে ১৮ জানুয়ারি পিঠা উৎসবের আয়োজন করা হয়। একজন প্রধামন্ত্রীর বাড়িতে পিঠা উত্সব হতে পারে না এমন কথা নয়, তবে পিঠা উত্সবের সময় তিনি যে রাষ্ট্রীয় প্রটোকল মেনে চলেননি, পত্র-পত্রিকার খবর থেকে তা স্পষ্ট হয়ে গেছে। খবরে প্রকাশ ‘শত ব্যস্ততার মাঝে একটি অন্য রকম দিন পার করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর অন্যরকম দিনটি হচ্ছে নিরাপত্তার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে সবার সঙ্গে কুশল বিনিময়। শেখ হাসিনা আগত অতিথিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় শেষে নির্দিষ্ট আসনে নয়, সোজা গিয়ে বসলেন ঘাসের ওপর পাতানো শতরঞ্জিতে।’ একজন প্রধানমন্ত্রী তাঁর নির্দিষ্ট আসনে না বসে যখন ঘাসের ওপর পাতানো শতরঞ্জিতে বসেন, তখন বুঝতে হবে প্রধানমন্ত্রীর জন্য যে প্রটোকল রাখা হয়েছিল, সে ব্যবস্থাকে অগ্রাহ্য করে তিনি ঘাসের ওপর পাতা বিছানায় গিয়ে বসেছেন। পৃথিবীতে এরকম খোলামনের দ্বিতীয় কোনো প্রধানমন্ত্রী খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। এখানে শেখ হাসিনা সবার থেকে আলাদা। শেখ হাসিনার সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা নিঃসন্দেহে অনন্য।প্রধানমন্ত্রী কতটা আবেগপ্রবণ এবং স্নেহ-বাত্সল তার একটি উদাহরণ এখানে তুলে ধরা যায়। পত্র-পত্রিকার খবর থেকে জানা যায়- “দেশে ফিরেছেন তাজউদ্দিনের পুত্র সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজীম আহমেদ সোহেল তাজ। শনিবার রাতে গণভবনে যান তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবেগে আপ¬ুত হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেন।” (সূত্র: সোনার দেশ, ২৫ জানুয়ারি) এখানেও প্রটোকল ভঙের একটি চমত্কার উদাহরণ। সোহেল তাজ আপন বোনদের কাছ থেকেও এমন আদর ভালোবাসা পেয়েছেন কি না সন্দেহ। কিন্তু বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকৃত বোনের আদর সোহেল তাজকে উজাড় করে দিয়েছেন। এমন উদাহরণ পৃথিবীর কোনো প্রধানমন্ত্রীর কাছে খুঁজে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ।
শুধু সোহেল তাজের ক্ষেত্রে নয়, আমরা লক্ষ্য করেছি সমাজের ভয়ঙ্কর বিপদগ্রস্থ দুস্থ মানুষদেরকে মাঝে মাঝে সাক্ষাত্কার দিয়ে থাকেন। টেলিভিশনে লক্ষ্য করছিলাম সন্ত্রাসীদের পেট্রোল বোমায় আহত আধপোড়া কিছু মানুষকে সাহায্য দেয়ার জন্য গণভবনে ডেকে নেয়া হয়েছিল। আহত মেয়েদেরকে কাছে পেয়ে শেখ হাসিনা আবেগে আপ¬ুত হয়ে তাঁদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরে ছিলেন। প্রটোকল ভেঙে এই অসহায় সাধারণ মেয়েদেরকে আদর করতে শেখ হাসিনা এতটুকু দ্বিধা করেননি। এমনটি একমাত্র শেখ হাসিনাই পারেন, অন্য কোনো প্রধানমন্ত্রী পারেন না।এ ক্ষেত্রে আমরা স্মরণ করতে পারি ঢাকায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে পরিবারের সবাই পুড়ে মারা গিয়েছিল, শুধু দুটি মেয়ে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল। জীবিত দুটির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি তাদের মায়ের শূন্যস্থান পূরণ করে বললেন- এখন থেকে তিনিই তাদের মা। মায়ের দায়িত্ব পালন করলেন। দুটি মেয়েকে বিয়ে দিয়ে তাদের সুখের সংসার স্থাপন করে দিলেন। এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেয়ে দুটির মায়ের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। মেয়ে দুটির ছেলে-মেয়েদের তিনি নানী বনে গেছেন। এমন উদাহরণ শেখ হাসিনাই স্থাপন করতে পেরেছেন, পৃথিবীর অন্য কোনো প্রধানমন্ত্রী মানবপ্রেমের এমন উদাহরণ স্থাপন করতে পারেননি। সবচেয়ে বড় কথা অসহায় মানুষের মধ্যে মমত্ববোধের প্রকাশের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার কোনো রকম কৃত্রিমতা নেই। প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ভেঙে অসহায় মানুষকে নিজের কাছে টেনে নেবার ক্ষমতা শেখ হাসিনার যেমনটি আছে, আর কোনো প্রধানমন্ত্রীর তা নেই। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রধানমন্ত্রী অনন্য এবং অসাধারণ।

লেখক : সাবেক ভিসি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ইউরোপ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসী তৎপরতায় বাংলাদেশি জঙ্গি!

Matiar Chowdhury

মতিয়ার চৌধুরী

জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগে ২৭ বাংলাদেশিকে সিঙ্গাপুর থেকে দেশে পাঠানোর ঘটনাটি উদ্বেগজনক। সিঙ্গাপুর পুলিশের দাবি অনুযায়ী আলকায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের মতো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সঙ্গে এদের সংশি¬ষ্টতা রয়েছে। এছাড়াও এরা সিঙ্গাপুরে বসে বাংলাদেশে নাশকতার ছক কষছিল। বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশে জঙ্গি তৎপরতায় অভিযুক্ত হওয়া এবং বিদেশে অবস্থান করে তাদের দেশবিরোধী তৎপরতায় শামিল হওয়া- দেশের ভাবমূর্তি এবং নিরাপত্তা দুই বিবেচনাই খুবই উদ্বেগের। শুধূ সিঙ্গাপুর কেন ইউরোপ মধ্যপ্রাচ্য সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই জঙ্গিরা সক্রিয়। বাংলাদেশকে বিশেষ করে বর্তমান সরকারকে টার্গেট করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে কয়েকটি চ্যারিটি সংগঠনের ব্যানারে দেশীয় জঙ্গিদের অর্থের যোগান দিচ্ছে কয়েকটি গ্রুপ। যদিও বাংলাদেশ সরকার বলছে বাংলাদেশে আইএস এর অস্থিত্ব নেই, তার পরেও প্রশ্ন থেকে যায়? আইএস এর অস্থিত্ব না থাকলে বাংলাদেশের প্রতিটি জঙ্গিসংগঠনই আইএস আলকায়দা ও তালেবানের আদর্শে বিশ্বাসী। জঙ্গিদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক এবং অভিন্ন। সুতরাং আই এস এর অস্থিত্ব নেই বলে বসে থাকলে চলবেনা। সম্প্রতি গড়ে উঠা উগ্রবাদী সংগঠন গুলোকে দমন করার পাশাপাশি তাদের অর্থের উতস বন্ধ করতে হবে। গত ২১ জানুয়ারী সবকটি জাতীয় দৈনিকে গুরুত্বসহ সচিত্র খবরটি ছাপা হয়েছে। এসব প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সিঙ্গাপুরে বসে উগ্রপন্থী জিহাদি মতাদর্শের চর্চা এবং বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা করার অভিযোগে সে দেশে নভেম্বরের ১৬ থেকে ডিসেম্বরের ১ তারিখের মধ্যে আটক হয় ২৭ বাংলাদেশি নাগরিক। এরা সিঙ্গাপুরে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করত। সিঙ্গাপুর পুলিশের তদন্তে আবিষ্কৃত হয়েছে, জঙ্গি সংগঠন আলকায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মতাদর্শে অনুগত হয়ে তারা একটি পাঠচক্র পরিচালনাসহ সাংগঠনিক তৎপরতা চালাচ্ছিল। বাংলাদেশে ফিরে এসে সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদি কর্মকান্ডে অংশ নেয়ার ইচ্ছা ও পরিকল্পনা ছিল তাদের। গত এক সপ্তাহে এদের ২৬ জনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে মঙ্গলবার ১৪ জনকে ৪ দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেছে, বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা ছাড়াও আলকায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জন্য কর্মী সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সিঙ্গাপুরে গোপন বৈঠক করত।
একদিকে দেশেও নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন এবং অনুরূপ আদর্শের নতুন নতুন গোষ্ঠীর সংগঠিত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে বিদেশেও জঙ্গি মতাদর্শ নিয়ে সক্রিয় রয়েছে কিছু বাংলাদেশি নাগরিক। এর আগে ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমানে একটি বোমা-গোলা তৈরির কারখানায় বিস্ফোরণে শাকিল আহমেদ মোল¬া ও সোবহান মন্ডল নামে দুই ব্যক্তি নিহত হয়। তাদের পরিচয় আবিষ্কৃত হয় যে তারা বাংলাদেশের নাগরিক এবং এ নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএমবির সদস্য। ভারতীয় গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী এ দেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএমবির সদস্যরা ভারতের মাটিতে অস্ত্র গোলার কারখানা বসিয়েছিল এবং সেখানে প্রস্তুত অস্ত্র-গোলা বাংলাদেশে নাশকতা ঘটনারো জন্য পাচারও করছিল। ভারতের বোমাকান্ডে বাংলাদেশের জেএমবি কানেকশন তখন বিদেশে বাংলাদেশি জঙ্গিদের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছিল। এবার সিঙ্গাপুরে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের মধ্যে ২৬ জনের জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগে আটক ও ফেরত আসা সেই উদ্বেগকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। বিশ্বব্যাপী উগ্রবাদের উত্থানের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি জঙ্গি বিদেশের মাটিতে গ্রেপ্তার ও দেশে পাঠানোর প্রতিক্রিয়া নানামাত্রিক। এ ঘটনার পর এখন বাংলাদেশি শ্রমিকরা বিদেশে বিশেষ করে সিঙ্গাপুরে কঠোর নজরদারির মধ্যে থাকবে। এমনকি জনশক্তি রপ্তানিতেও এই ঘটনা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমিকরা জঙ্গি তৎপরতার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তার বড় মাশুল দিতে হবে। কাজেই বিষয়টিকে অত্যন্ত গুররুত্বর সঙ্গে দেখতে হবে ও সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সিঙ্গাপুর সরকার যেসব অভিযোগ করছে এগুলো ধরে জোর তদন্ত চালাতে হবে। এ ব্যাপারে সংশি¬ষ্ট মন্ত্রণালয় ও সহযোগী সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অন্যদিকে বিদেশে বসে দেশবিরোধী তৎপরতা চালানোর বিষয়টি দেশের নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলোর বিভিন্ন সময় জামিনে মুক্তি পাওয়া বা পলাতক সদস্যরা ভিন্ন কোনো দেশে আশ্রয় নিয়ে দেশের ভাবমূর্তি ও নিরাপত্তা সংকট তৈরি করছে না এ ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিতেও সংশি¬ষ্টদের তৎপরতা জোরদার করতে হবে।

ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় মাদরাসা ছাত্রদের উসকানী দিয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের নেপথ্যে কে?

Matiar Chowdhury

–মতিয়ার চৌধুরী

অতি তুচ্ছ একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘর্ষে এক মাদরাসা ছাত্রের মৃত্যুই শুধু হয়নি, এর জের ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরজুড়ে ১২ জানুয়ারী মঙ্গলবার দিনভর ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও নৈরাজ্যকর ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি নিতান্তই দুঃখজনক। যে কোনো ঘটনা ‘সামান্য’ দিয়ে শুরু হলেও সহনশীলতা, সংযম ও ধৈর্যের পরিচয় না দিলে তার ফল কত মারাত্মক হতে পারে- ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
জানা গেছে, সোমবার বিকালে শহরের জেলা পরিষদ মার্কেট এলাকায় একজন ইজিবাইক চালকের সঙ্গে শহরের সবচেয়ে বড় মাদ্রাসা জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়ার এক ছাত্রের বাকবিতন্ডা শুরু হলে মধ্যস্থতা করতে এক ব্যবসায়ী এগিয়ে আসেন। পরে ওই ছাত্র ব্যবসায়ীর সঙ্গেও বাকবিতন্ডায় জড়ায়। এ প্রেক্ষাপটে মাদ্রাসা ছাত্ররা ওই ব্যবসায়ীর দোকান ভাংচুর করলে মাদ্রাসার ছাত্রদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষ বাঁধে। একপর্য্যায়ে ছাত্রলীগও ব্যবসায়ীদের পক্ষে সংঘর্ষে যুক্ত হয়।
পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশকে রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করতে হয়। সংঘর্ষে আহত এক মাদ্রাসাছাত্র হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলে মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্ররা রেলস্টেশন, আওয়ামী লীগের কার্যালয়, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গনসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাংচুর ও তাণ্ডব চালায়।

B Baria madrashaপ্রতিটি ধর্মের অন্তর্নিহিত মর্মবাণী হচ্ছে শান্তি। অশান্তি নৈরাজ্য ও বিশৃংখলা সৃষ্টি শুধু সামাজিক ও রাজনৈতিক নয়, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও পরিত্যাজ্য। মাদ্রাসায় যারা শিক্ষাদান ও শিক্ষা লাভ করেন, ইসলামের আদর্শ ও ভাবধারার সঙ্গে তাদের রয়েছে আত্মিক বন্ধন। শান্তি ও মানবতার ধর্ম হিসেবে ইসলাম কখনোই সংঘাত ও নৈরাজ্য সমর্থন করে না। মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকরা এটি জেনেও গোটা ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি ও জনমনে আতংক তৈরি করেছেন, এটি পরিতাপের বিষয়।
একইসঙ্গে যে কোনো সংঘাতে ছাত্রলীগের সম্পৃক্ত হয়ে পড়ার বিষয়টিও সমর্থনযোগ্য নয়। কোথাও কোনো গোলযোগের আশংকা দেখা দিলে, তা সামাল দেয়ার জন্য দেশে প্রশাসন আছে, আইনশৃংখলা বাহিনী আছে। প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান মেনে তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবে- এটাই স্বাভাবিক নিয়ম।
আশার কথা, শেষ পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সমঝোতা হয়েছে। এ সমঝোতার আলোকে বিক্ষুব্ধরা হরতাল পালনের ঘোষণা দিলেও পরে তা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। অন্যদিকে প্রশাসনও মাদরাসা কর্তৃপক্ষের কিছু দাবি-দাওয়া মেনে নিয়েছে। ১৪ জানুয়ারী এক সংবাদ সম্মেলনে জামিয়া ইসলামীয়া ইউনুছিয়া মাদরাসার প্রিন্সিপাল মুফতি মোবারক উল্ল¬াহ বলেছেন “মাদরাসার ছাত্ররা নয়, দুষ্কৃতকারীরাই মাদরাসা ছাত্রদের নামে এই হামলা চালিয়েছে।” সহিংসতার ঘটনায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ জেলা সদর হাসপাতাল, রেলওয়ে স্টেশনে হামলা, ওস্তাদ আলাউদ্দিন সঙ্গীতাঙ্গনসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনে হামলার ঘটনায় মাদ্রাসার পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য রক্ষার আহবানও জানান তিনি। তবে কোনো মাদ্রাসা ছাত্র সহিংসতায় জড়িত থাকলে তদন্তের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও আহ্বান জানান তিনি। সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন তালিমিয়া বোর্ডের চেয়ারম্যান আশেকে এলাহী ইব্রাহিমি, নাজিমাত তালিমাত মুফতি শামছুল হক, জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসার সিনিয়র মুহাদ্দেস মুফতি আবদুর রহিম কাসেমী প্রমুখ। হামলাকারীরা জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন ভাংচুরের পাশাপাশি সুর সম্রাটের স্মৃতি বিজড়িত বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রও পুড়িয়ে দেয় মাদরাসার ছাত্ররা। ভাংচুর করা হয় জেলা শিল্পকলা একাডেমি, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমপে¬ক্সের ব্যাংক এশিয়া এবং প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র। ঐসব প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাংচুরের নেপথ্যে কাজ করেছে একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী । তাদের টার্গেট ছিল আওয়ামী লীগ কার্য্যালয়, ব্যাংক ও ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খা’র স্মৃতি বিজরিত যে অমূল্য সম্পদ তারা ধ্বংশ করেছে এর দ্বায় দায়িত্ব নেবে কে?
ব্রাহ্মণড়ীয়ার ঘটনা আর ২০১৩ সালে রাজধানীর শাপলা চত্বরের ঘটনার মধ্যে অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ২০১৩ সালে ঢাকায় যে ভাবে ব্যাংক ব্যাবসা প্রতিষ্টনে হামলা হয়েছে ঠিক একইভাবে ব্রাম্মনবাড়ীয়ায় এমন নিশংসতার ঘটনা ঘ্েটছে। ঘটনার সময় যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের অনেকেই বলেছেন আফগান ফেরত জনৈক মৌলানা যে ২০১৩ সালে ঢাকায় হেফাজতের সমাবেশে হামলা ও ভাংচুরের নেতৃত্ব দিয়েছিল। ওই মৌলানা মাদরাসা ছাত্রদের সাথে নিয়ে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ যাদুঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করেছে। ব্রাহ্মণড়ীয়ার ঘটনার টিভি ফুটেজ ও ছবি ভাল ভাবে দেখলেই হামলাকারী সনাক্ত করা সম্ভব। ঐ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জামায়াত হেফাজতিরা চেয়েছিল বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে। তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়নি তবে এই অশুভ শক্তি এখনও তৎপর।
লেখক: সাংবাদিক, গবেষক , লন্ডন ১৬ জানুয়ারি ২০১৬

Scroll To Top

Design & Developed BY www.helalhostbd.net