শিরোনাম

বাংলার প্রাচীন দুই মহিলাকবি সৈয়দা ছামিনা ভানু ও সহিফা ভানু উরফে (হাজীবিবি) ——-মতিয়ার চৌধুরী

বাংলাসাহিত্যের উজ্বল নক্ষত্র বৃহত্তর সিলেট তথা সমগ্রবাংলার গর্ব দুই প্রাচীন মুসলিম মহিলা কবি সৈয়দা সামিনা ভানু ও সহিফা ভানু উরফে হাজিবিবি সম্পর্কে এই প্রজন্মের অনেকই জ্ঞাত নন। বৃহত্তর সিলেটের কৃতি দুই মুসলিম মহিলাকবিকে নিয়ে আলোকপাত করতে চাই।
নারী জাগরনের কবি সহিফা ভানু ওরফে ( হাজীবিবি)
কবি সহিফা ভানু ওরফে ( হাজীবিবি) আজ থেকে দেড়শ বছর পূর্বে সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার রামপাশা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সিলেটবাসীর গর্ব এই মহিলা কবির সঠিক জন্ম তারিখ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, তবে গবেষকদের অনেকেই মনে করেন তিনি ১৮৫০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তা-ও অনুমান নির্ভর। কেউ কেউ তাঁকে সিলেটের প্রথম মহিলা কবি বললেও এর সাথে আমাদের দ্বিমত রয়েছে। সিলেটের প্রথম মহিলা কবি হলেন মরমী সাধক সৈয়দ শাহনুরের সহর্ধীর্মিনী দেওয়ান সৈয়দা ছামিনা ভানু। সে যাক প্রথমে আমরা কবি সহিফাভানু উরফে হাজীবিবি ও তার সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে আলোচনা করতে চাই। তার পিতার নাম দেওয়ান আলী রেজা চৌধুরী, বড় ভাই দেওয়ান উবেদুর রাজা চৌধুরী ছিলেন ফার্সী ভাষায় সুপন্ডিত এবং একজন নাম করা কবি। মরমী কবি দেওয়ান হাছন রাজা কবি সহিফাভানুর বৈমাত্রেয় ভ্রাতা। গবেষক মরহুম মনির উদ্দিন চৌধুরী এবং ফজলুর রহমান সাহেবের মতে হাজীবিবি ছিলেন সুশিক্ষিত একজন মহিলা, উর্দূ, ফার্সী এবং বাংলা ভাষায় তাঁর বেশ দখল ছিল। মরমী সাধক দেওয়ান হাছন রাজা এই মহিলাকে বেশ শ্রদ্ধা করতেন ,শুধু বড় বোন হিসেবে নয় একজন কবি হিসেবে। সহিফা ভানুর বিয়ে হয় সিলেট শহরের কুয়ারপার নিবাসী আব্দুল ওয়াহেদ উরফে হাজী হিরন মিয়ার সাথে, হাজী হিরন মিয়া ছিলেন সে সময়কার একজন জ্ঞানী মানুষ, সহজ সরল এবং উদার। সহিফা ভানু একাধিকবার হ্জ্জ্ব পালন কারায় সাধারণ মানুষের কাছে হাজী বিবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি ছিলেন ধার্মিক তবে ধর্মান্ধ ছিলেন না। সে আমালে খান্দানী মুসলিম পরিবারের মহিলারা বোরখা ব্যবহার করলেও তিনি তা পছন্ধ করতেন না। তিনি দক্ষতার সাথে জমিদারী পরিচালনা করতেন। কোন সময়ই তিনি সমালোচনার সম্মুখীন হননি। এই মহিলা ছিলেন নিঃসন্তান। তিনি খুব সৌখিন মহিলা ছিলেন, গরীব এবং অসহায়দের সব সময় সাহায্য করতেন। সে সময় হাজী বিবি সিলেট শহরে নিজের বসবাসের জন্যে যে বাড়ী নির্মাণ করেন। ঐ বাড়ীটি ছিল সে আমলে দেখার মতো তাই সিলেটে হাজী বিবির বাড়ীকে ঘিরে এমন একটি গানও আছে।
গানটি হলো ঃ
“ আমরা যাইমুনিগ সুরমা নদীর পাড়
আমরা দেখমুনি’গ হাজী বিবির বাড়ী
সিলেট কুয়ার পাড়।’’
তার ছোট ভাই মরমী সাধক দেওয়ান হাছন রাজা প্রথম জীবনে একজন অত্যাচারী জমিদার ছিলেন। সহিফাভানু হাছন রাজাকে সমীহ করতেন কিন্তু ভাইয়ের অধঃপতনে ব্যথিত হয়ে উর্দূতে একটি কবিতা লিখেন ঃ-
‘‘হাছন রাজনে এয়সা জুলুম কিয়া
এতিম কু -কসকে লেকে আতশ মে ঢাল দিয়া।
ইয়ে দুনিয়া ফানি হায়, একরোজ যানা হোগা,
জোর জুলুম কা মজা উধার যাকে চাখনা হোগা
সহিফা বেউকুফ নে এয়সা বেওকুফি কিয়া-
হাছন কু খাতির করকে , এতিম কু ডুবা দিয়া।’’
’সহিফা সঙ্গীত’ ’’ ছাহেবানের জারী’’ ও ’’ইয়াদগারে ছহিফা’’ নামে তার তিনটি গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়। ইতিহাস বেত্তা মনির উদ্দিন চৌধুরীর মতে সহিফাভানুর সাহিত্যে আধ্যাত্মিক সুরে অতরঞ্জিত হলেও মর্ত্য জীবনের প্রতি তার বিমুখতা নেই। তিনি স্বর্গ ও মর্ত্যকে এক করে একেঁছেন তার কাব্যে। তিনি ছিলেন নারী জাগরণের অগ্রদুত। নির্যাতিত নারী সমাজের বেদনায় তিনি প্রতিবাদ মুখর। নারী জাগরনে বা নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে তার বেশ কয়েকটি সুন্দর লেখা রয়েছে এর মধ্যে উল্লেখ যোগ্য কয়েকটি লিখা আমাদের পাঠকদের জন্যে তুলে ধরতে চাই।

‘সহিফা বলে শোন পুরুষের পাষান মন,
জন্মের সতী সীতা ছিল
রামে সীতা না চি্িনল
তাই সীতারে ত্যাগ করিল , ঘটে গেল অঘটন।’
সমাজের শঠতা ও চৌর্যবৃত্তিতে তাঁর দৃষ্ঠি এড়ায়নি, মন্দ লোকের ব্যাপারে তিনি ছিলেন সোচ্চার তাইতো লিখেছেন ঃ
-‘চোরা যারা ভালা তারা
টাকার বল তাই যায় না ধরা।’
তার লিখা থেকে সে সময়কার বিচার ব্যবস্থারও একটি চিত্র ফুটে উঠেছে সুন্দর ভাবে। বিভাগীয় দীর্ঘসূত্রতা, এবং বিচার দুর্ভোগ নিয়ে তিনি লিখেছেন ঃ
‘‘ মোন্সেফী হইতে হাইকোর্টে যায়
পাঁচ সাত বৎসরে।’’
এছাড়া রাষ্ঠ্রীয় সামাজিক এবং রাজনৈতিক ত্রুটি বিচ্যুতি এবং অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধে তিনি লিখেছেন, তার সাহিত্যে হিন্দু- মুসলিম সংস্কৃতির সমন্বয় খুঁজে পাওয়া যায়।
স্বরস্বতীকে প্রণাম করে ভক্তি ভরে চরণ ধরে
গাব নাম মধুর স্বরে, যদি মা কৃপা করে।
আবার লিখেছেন ঃ-
‘মা গঙ্গাকে স্মরণ করি গানের বোঝা লৈয়া ফিরি
ছহিফায় বলে মাগো আছি তোমার চরণ ধরি।
কবি সহিফাভানুর লেখনিতে ইসলামী জীবনদর্শন, বৈষ্ণব সাধনা, বাউল চর্চা পীর প্রসস্তি সমান ভাবে স্থান পেয়েছে। শেষ জীবনে তিনি সুফীবাদের প্রতি আকৃষ্ঠ হন। এসব তার লেখনিতেই ফুটে উঠেছে। তার বাছাইকৃত লিখা থেকে কয়েকটি লিখা তুলে ধরতে চাই। প্রথমে তার রচিত রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক একটি গান ঃ-
দেখে আস গে রাধা রাণী আছেরে কেমন
মথুরাতে আছি আমি হৈয়া রাজন
রাধার জন্য ত্যাগ করিব রাজ্য সিংহাসন।
সহিফা বলে শুন ভূবন মোহন-
কুঞ্জার কুবুদ্ধিয়ে তুমি হয়েছ বন্ধন।

যখন তিনি হজ¦ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা যাত্রা করেন তখন একটি গান লিখেন জানা যায় এটিই তার শেষ লিখা।
আমি তোমার তুমি আমার আর’ত কেহ নাই।
জন্মের মত বিদায় হয়ে মদিনাতে যাই।
বঙ্গদেশের বড় ওলি শাহজালাল পীর
আনন্দে বিদায় দিয়ে আমায় কর স্থির।

গবেষক ফজলুর রহমান সিলেটের একশতএকজন গ্রন্থে পীর মাহমুদ আলী শাহ সহিফাভানুর মুর্শিদ বলে উল্লেখ করেছেন। সাধক হাছন রজা ও সহিফা ভানু আপন ভাই বোন হলেও সাহিত্য চর্চা করেছেন একই সময়ে। হাছন রাজার কথা এ প্রজন্মের মানুষ জানলেও সহিফাভানু রয়ে গেছেন অজ্ঞাত। হাছন রাজাকে উদ্দেশ্য করে সহিফাবানুর একটি গান তা হলোঃ-

সুনামগঞ্জের হাছন রাজা আলী রাজার নন্দন
টাকা-কড়ি অন্ন-বস্ত্র সদাই করে বিতরন
আইস ভাই ধন , বইস তুমি মসলন্দের উপর।

কবি সহিফাভানু ১৯১৭ সালে ইহলোক ত্যাগ করেন। তবে তার সঠিক জন্মমৃত্যু তারিখ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
বাউল কবি সৈয়দা ছামিনা ভানুঃ
সৈয়দা ছামিনা ভানু বাংলাদেশের প্রথম মুসলিম মহিলা কবি। অধ্যাপক আসাদ্দর আলী তার জন্মকাল ১৭৬০ খৃস্টাব্দ বলে উল্লেখ করেছেন। কবি সহিফা ভানু উরফে (হাজীবিবি) এবং সৈয়দা ছামিনা ভানু প্রায় দেড়শ বছরের ব্যবধানে একই এলাকা জন্মগ্রহণ করলেও তাদের সাহিত্য সাধনার মাঝে একই ভাবধারা লক্ষনীয়। উভয়েই সোনার চামচ মুখে নিয়ে জমিদার পরিবারে জন্ম নিলেও কাজ করে গেছেন সাধারন মানুষের জন্যে । একজন জমিদারী ত্যাগ করে নিজকে নিয়োজিত করেন সুফী সাধনায়। অন্যজন কোনদিনই জমিদারীর ধারেকাছে যাননি স্বামীর হাত ধরে বাউল হিসেবে ঘুরেছেন গ্রামে গঞ্জে। উভয়ের ক্ষেত্রেই বাউল অভিধা প্রযোজ্য। সাধক কবি সৈয়দা ছামিনা ভানু তার লিখা একটি গানে বলেছেনঃ——
‘‘ কহে বিবি ছামিনা ভানু শাহানুরের তিরি
মুর্শিদের লাগিয়া আমি দিবানিশি ঝুরি।।
সৈয়দা ছামিনা ছিলেন নবীগঞ্জের দিনারপুরের সদরঘাটের দেওয়ান বসির উদ্দিনের প্রথম কন্যা । সৈয়দ শাহনূর তার একটি গানে তিনটি বিয়ের কথা উল্লেখ করেছেনঃ-
তিনবার পাগলে শরীয়ত করিল
এর অর্থ তিনি তিনটি বিয়ে করেন। ছামিনা ভানু ছাড়া অন্য স্ত্রীদের নাম পাওয়া যায়নি। বর্তমান সময়ে সৈয়দ শাহানুরের অনেক গানই মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। একজনের কাছ থেকে শুনে যখন অন্যজন গায় এতে গানের অর্থ এবং উŽচারন বদলে যাচ্ছে। সৈয়দ শাহানুর শুধু একজন মরমী কবিই ছিলেন না, একজন মওজুফ ফকিরও।

্এছাড়া সৈয়দ শাহনূর তার আরো ্একটি গানে বলেছেনঃ——
কদমহাটা বিনেছিরি
শানূরে না পাইলা বাড়ি
সৈয়দ শাহনূর সিলেটের বিভিন্ন স্থানে গিয়েছেন বসত করেছেন। কোথাও তিনি স্থায়ী আবাস গড়েননি। তিনি যেথায় গেছেন ছামিনা ভানু সব সময়ই তার সাথে ছিলেন। সৈয়দ শাহানুরের তিনপুত্র তারা হলেন সৈয়দ আব্দুল জব্বার, সৈয়দ আব্দুল জহুর, সৈয়দ আব্দুল জাহির। সৈয়দ শাহানুর (১)নূর নছিহত (২) রাগনূর (৩) নূরের বাগান (৪) সাত কইন্যার বাখন এবং মনিহার নামক কয়েকটি মূল্যবান পুঁথি সিলেটী নাগরী হরফে লিখে গেছেন। তার লিখা ঐসব পুঁথিতে কয়েক হাজার মরমী গান স্থান পেয়েছে, লিখেছেন সমসাময়িক ঘটনার কথাও, তার নিজের স¤পর্কে অনেক তথ্য রয়েছে ঐসব পুথিতে।

Scroll To Top

Design & Developed BY www.helalhostbd.net