শিরোনাম
প্রসঙ্গঃ ‘ঈদ’ না ‘ইদ’ : বাংলা একাডেমি নিজেই অসংগত

প্রসঙ্গঃ ‘ঈদ’ না ‘ইদ’ : বাংলা একাডেমি নিজেই অসংগত

Nazmul Islam

নাজমুল ইসলাম

দেশের মানুষের রক্ত আর ঘামঝরানো টাকায় পোষা হয় বাংলা একাডেমির কর্মকর্তাদের। তাদের কাজ সময় ও পারিপার্শ্বিকতার নিরিখে ভাষার গবেষণা-উন্নয়ন। কিন্তু তারা এর কতটুকু করছেন; বৎসরে একটা মেলার আয়োজন করেন। এতে স্টল পেতে হলে দেখা যায় তাদের রাজনৈতিক তোষণের গভীরতা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় দলবাজিই তাদের প্রধান কাজ, নেশা ও পেশা। সম্প্রতি তাদের সুমহান গবেষণাযজ্ঞের কথা জানতে পারলাম। ‘ঈদ’ বানানে ‘ইদ’ হবে। ঈদের ‘ঈ’ দিয়ে নয়, ইতরের ‘ই’ দিয়ে! এরা বাংলা বানানের নিয়মে এক বাইবেলীয় বিধান সংযুক্ত করেছিলেন, “বিদেশি শব্দে ঈ-কার থাকবে না , তদস্থলে ই-কার দিতে হবে।” কেন থাকবে না এর সঠিক ব্যাখ্যা নেই। এই ভিত্তিহীন নিয়ম অনুযায়ীই ‘ঈ’ স্থলে ‘ই’ লিখতে হবে। জলের মত সহজ আইন । এ আইন অনুযায়ীই ঈদ বানানে ‘ই’ সংগত, আর ‘ঈ’ অসংগত। না মানার কী আছে। কেউ না মেনে পাণ্ডিত্য দেখাতে চাইলে জামাতি তকমা তো আছেই। ইতোমধ্যেই ডিজি সাহেব বলেও ফেলেছেন যে, জামাতিরাই নাকি এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করছে। বিদেশি শব্দের বানান, অর্থ ও ব্যুৎপত্তির দিকে না তাকিয়ে এরকম গাঁজাখুরি বিধান চালু করলে আফ্রিকার জঙ্গলবাসীও মেনে নিবে না। অবশ্য একাডেমি দুই যুগ ধরে নিজেই এ আইন লঙ্ঘন করে তাদের সব বই ও সাইনে ‘বাংলা একাডেমী’ লিখে আসছিল। কত উপহাস্য এ প্রতিষ্ঠানটি। নিজেরাই নিজেদের প্রণীত বিধান মানে না। ডিজি সাহেব তো প্রধানমন্ত্রীর প্রিয়ভাজন। তিনি ঈদটা যেভাবে ইদ করলেন, সে নিয়মে তো আওয়ামী লীগও ভুল শব্দ; এটা শুদ্ধ করে আওয়ামি লিগ লিখতে বলুন, দেখি তার বিধান কথটা কার্যকর হয়। ভণ্ডামিরও একটা সীমা থাকা দরকার। এ অবস্থায় কী করবে দেশের শিক্ষিত সমাজ; সব জায়গায় জবরদস্তি চালিয়ে অজ্ঞানতার অন্ধকারে ঠেলে দেয়া হচ্ছে নতুন প্রজন্মকে। বলা হচ্ছে ভাষার সহজীকরণ হচ্ছে; বিশেষত বাচ্চাদের জন্য। এভাবে না জেনে না বুঝে হুটহাট বানানরীতি বদলালে এবং নিজেদের বইয়েই তা না মানলে কেমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তা সহজেই অনুমেয়। অজস্র সময় ও কোটি কোটি টাকার অপচয় হয়, শব্দের প্রকৃত অর্থ বদলে যেতে থাকে; আর তা যদি হয় ধর্মগ্রন্থীয় শব্দ তবে তো কথাই নেই; স্থানবিশেষে কুরুক্ষেত্র বেঁধে যায়; সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ায়, (কারণ বানানবিধানে আছে তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ অক্ষুণ্ণ থাকবে, এগুলোর দীর্ঘস্বরকে হ্রস্ব করলে অর্থের পরিবর্তন হয় বলে সনাতন ধর্মবেত্তাগণ কড়া আপত্তি তোলেছিলেন। এ ধরনের আপত্তি তো একই কারণে আরবি ফারসির ক্ষেত্রে মুসলিম ধর্মবেত্তাগণও করবেন) সর্বোপরি এ ধরনের ভিত্তিহীন ও অপরিণামদর্শী পরিবর্তনের ফলে ভাষা শ্রীহীন, দুর্বোধ্য ও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। এত বিকল্প শিশুদের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর। তারা একেক বিষয় পড়তে গিয়ে একেক বানান দেখে আরো বিভ্রান্ত হয়। তখন তাদের কাছে ইংরেজিকেই সহজ ভাষা মনে হয়। অথচ বাংলা পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ ও সুপ্রাচীন ভাষা। এর রয়েছে শৃঙ্খলাবদ্ধ সুন্দর বর্ণমালা, অফুরন্ত শব্দভাণ্ডার। তাই মনগড়া বিধান চালু করে শিশুদের মধ্যে মাতৃভাষা-ভীতি তৈরি করা গর্হিত অপরাধ। তাই সংস্কৃতের মত বিদেশি শব্দেরও প্রচলিত বানান অক্ষুণ্ণ রাখার কোনো বিকল্প নেই। যেমন- আওয়ামি নয়, আওয়ামী ই থাকবে; লিগ নয় লীগ থাকবে; সুপ্রিম নয় সুপ্রীম থাকবে; ইদ নয়, ঈদ থাকবে। দেশবাসী ক্ষিপ্ত হওয়ার আগে এরকম সব সঠিক বানান অক্ষুণ্ণ না রেখে উপায় নেই। আধুনিক বাংলা অভিধানে ‘ইদ’ শব্দটির ভুক্তিতে বলা হয়েছে, ” ‘ইদ/ইদ্/[আ.]বি. ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব; (ইদুল ফিতর বা ইদুল আজহা); খুশি, উৎসব; ঈদ-এর সংগততর ও অপ্রচিলত বানান। ইদ মোবারক /ইদ্ মোবারক্/বি. ইদের শুভেচ্ছা বিনিময়কালে উচ্চারিত অভিবাদন।’ অন্যদিকে, অভিধানের ‘ঈদ’ ভুক্তিতে বলা হয়েছে, ‘/ইদ/[আ.]বি. ইদ-এর প্রচলিত ও অসংগত বানান।’ আবার বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে ‘ইদ’ শব্দের ভুক্তিতে নির্দেশ করা হয়েছে ‘ঈদ’।” যাই হোক, তাঁরা বোঝাচ্ছেন, ‘ইদ’ বানানটি সংগত আর ‘ঈদ ‘অসংগত? হায়রে পাণ্ডিত্য! এবার আমরা দেখব বাংলা একাডেমি কতটা সংগত। যদিও ডিজি শামসুজ্জামান খান ইতোমধ্যেই বলে বসেছেন, “এই পরিবর্তনে এত মাতামাতি করার কিছু নেই। আমার মনে হচ্ছে, জামায়াত অথবা কোনও উগ্রবাদী মতাদর্শের লোকজনের বিষয়টি নিয়ে বেশ মাথা ব্যথা শুরু হয়েছে।” রাজনৈতিক নেতাদের মত কথা বললেন; অথচ তার ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে তিনি রাজনীতিক নন; রাষ্ট্রের চাকর হিসেবে তার এ বক্তব্যও অসংগত। এই পরিবর্তনে বাংলা একাডেমির কারো মাতামাতির কিছু নেই- এক্ষেত্রে কথাটি ঠিকই আছে। কারণ যাদের মাথা নেই তাদের ব্যথাও নেই। কোনো বিষয না জানলে মাতামাতির কী বা থাকে বলুন? তবে একাডেমি ‘ঈদ’ এর বদলে ‘ইদ’ লিখে কী অপকর্মটি করেছে তা জানা দরকার । আরবি ‘ঈদ’ ( عيد) এর বাংলা অর্থ- আনন্দ, উৎসব, পর্ব ইত্যাদি । আর ‘ইদ’ (عد) এর বাংলা অর্থ- ব্রণ, ফোঁড়া, বিষফোঁড়া ইত্যাদি। একাডেমির সবাই আরবিতে অজ্ঞ, অথচ আমাদের বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারে বিদেশি শব্দের মধ্যে আরবির সংখ্যাই সর্বাধিক! আর এ ভাষা গবেষণার সুমহান দায়িত্ব যারা পালন করছেন তাদের কেউই আরবি জানেন না। তাইতো তারা আনন্দের বদলে বিষফোঁড়ার জন্ম দেন। ভাষা না জেনেও এর গবেষণা কেবল বাংলাদেশেই সম্ভব- কত হতচ্ছাড়া জাতি আমরা। বহুভাষাবিদ পণ্ডিতদের আসনে কারা বসে আছে! কে নেয় এসব খবর!

ঢাকা, ২৪ জুন ২০১৭১৭

Scroll To Top

Design & Developed BY www.helalhostbd.net