শিরোনাম
হাতের লেখার মর্মকষ্ট

হাতের লেখার মর্মকষ্ট

kib-prof

মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া

নিজের হাতের লেখাটা এখন যে কেমন হয়েছে, তা বোঝতে পারি না। এক সময় কোথাও বসলে, হাতের কাছে কাগজ কলম পেলেই আঁকিবুকি করতাম। হাতের লেখাটা খুবই প্রিয় ছিলো আমার। আমার একান্ত নিজস্ব একটা সম্পদ- হাতের লেখাটা। স্বরে-অ থেকে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত প্রতিটি অক্ষর একান্তই আমার নিজের মতো করে লিখতে শিখা। ছেলেবেলায় অক্ষরগুলোকে যেভাবে লিখতে শিখেছিলাম, সময়ের পরিক্রমায় শেষ পর্যন্ত শব্দগুলো একই ধাঁচের চেনা আকৃতিতে ক্রমান্বয়ে বেড়ে উঠেছে। নিজ হাতের অক্ষরগুলো নিজস্ব অস্তিত্বেরই একটা অংশ হয়ে গিয়েছিলো।
এসএসসি পরীক্ষার আগে বীজগণিত চর্চা করতে গিয়ে মান নির্ণয়ের কিছু অংকের প্রতি আমার একটা আশ্চর্য টান সৃষ্টি হয়েছিলো। আসলে অংকগুলোর মধ্যে কিছু কিছু সংখ্যা ছিলো যেগুলো আমার খুবই ভালো লাগতো। তাই কোথাও বসে যখনি আঁকিবুকি করতাম তখন বেশিরভাগ সময়েই ’47’ লিখতাম। 4 ও 7 এ দু’টো সংখ্যা আমি কত হাজার বার যে লিখেছি তা জানি না। কেন জানি এ দু’টো সংখ্যার প্রতি আমার এক ধরনের বিশেষ টান সৃষ্টি হয়েছিলো।
হয়তো এর কোন মনোস্তাত্বিক ব্যাখ্যা রয়েছে। তবে আমি জানি না। এ ব্যাপারে আগে ভাবিনিও কখনো।
এছাড়াও বাংলায় একটি শব্দ লিখতাম- তা হলো ‘কাগজ’। কলম-কাগজেতো লিখেছি, কাঠি দিয়ে মাটির ওপরে লিখেছি, পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে বালির গায়ে আঁচড় কেটে ‘কাগজ’ শব্দটি হাজারো বার লিখেছি। কেন যে ‘কাগজ’ শব্দটির প্রতি এমন মায়া সৃষ্টি হয়েছিলো তাও জানি না।
তবে, প্রতিবারই শব্দ এবং সংখ্যাগুলো লেখার সময় ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেয়ার চেষ্টা করতাম। জানি না, কেন যে করতাম- তা একেবারেই অজানা।
বর্তমান সময়ে এসে কীবোর্ড টিপে টিপে লিখতে গিয়ে কখন কোন ফাঁকে যে নিজের লেখার রং ও রূপটাকে হারাতে বসেছি তা ভেবে ভেবে মাঝে মাঝে খুবই কষ্ট হয়। মাঝেমাঝেতো দমটাই বন্ধ হয়ে আসে। যেন কোন শিশুর প্রিয় কোন খেলনা হারিয়ে যাবার কষ্ট। গুমড়ে গুমড়ে বুক-ভাঙ্গা অদম্য কান্নার কষ্ট, যেন বুক ভেঙ্গে যায়।
আমার এসব বিষয়গুলো খুব একটা স্বাভাবিক ব্যাপার নয় বলেই মাঝে মাঝে ভাবি। মাঝে মাঝে এ জাতীয় অনুভূতিকে প্রশ্রয় দেবো না বলে নিজেকে শাসাই। কিন্তু মাঝে মাঝে নিজের মাঝে হারাতে হারাতে সহসাই সম্বিত ফিরে পেতে পেতে খেয়াল করে দেখি আমি আমার হাতের লেখাকে নিয়েই ভাবছি। সব সময় যে এমন ঘটে তা নয়। তবে মাঝে মাঝেই ঘটে। যখন ঘটে তখন নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি না, নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিজের সাথে যুদ্ধ করতে হয়।
এমনিতেই ধুলোমলিন আমার এই ভূগোলকে নানাবিধ কষ্টের সমাহার প্রতিমুহূর্তে এসে সব কিছু ওলট-পালট করে দেয়। এর মধ্যে যদি হাতের লেখার কষ্টে বুকটা হাঁসফাঁস করে তাহলে কোথায় যাই! কার কাছে আশ্রয় খুঁজি।
আচ্ছা, মানব-জন্মটা কি অসংখ্য কষ্টের অসহ্য মর্মযাতনায় পরিবেষ্টিত একটি সুশৃঙ্খল হাহাকার, যার কোন শেষ নেই!

Scroll To Top

Design & Developed BY www.helalhostbd.net