শিরোনাম
আশা ছাড়েননি মলি একিদন হয়ত মায়ের দেখা মিলবে-সেই ভাবনায় চলছে তার ঠিকানাহীন অভিযাত্রা

আশা ছাড়েননি মলি একিদন হয়ত মায়ের দেখা মিলবে-সেই ভাবনায় চলছে তার ঠিকানাহীন অভিযাত্রা

তিন দশকের বেশি সময় ধরে হাসপাতালের নথিপত্র আর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ঘেটে বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধের অনেক তথ্য পেলেও মায়ের হদিস পাননি কানাডা প্রবাসী একাত্তরের যুদ্ধশিশু মলি।

তবে আশা ছাড়েননি, একিদন হয়ত মায়ের দেখা মিলবে-সেই ভাবনায় চলছে তার ঠিকানাহীন অভিযাত্রা।

প্রথমবারের মতো নিজের মাতৃভূমিতে এসে মলি জানিয়ে গেলেন জন্মদাত্রীর জন্য তার অন্তরের আকুতি। বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহের কথাও বললেন তিনি।

গতকাল রোববার বিকালে রাজধানীর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে একাত্তরের যুদ্ধশিশু শামা জমিলা মলি হার্ট নিয়ে এসেছিলেন তার স্কুলপড়ুয়া মেয়ে সাভানা বোনেলকে।

তাদের সঙ্গে আসেন কানাডাপ্রবাসী মুক্তিযুদ্ধ গবেষক মোস্তফা চৌধুরী, একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলিম চৌধুরীর মেয়ে ডা. নুজহাত চৌধুরী শম্পা। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারোয়ার আলী, এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা অক্সফামের কর্মকর্তা জুলিয়ান ফ্রান্সিস।

মোস্তফা চৌধুরী জানান, একাত্তরের যুদ্ধ শিশুদের নিয়ে কাজ করতে আসা জেনেভাভিত্তিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যাল সার্ভিসের মাধ্যমে মলিকে দত্তক নেন কানাডার মন্ট্রিয়লের বাসিন্দা জোয়েল হার্ট ও ট্রুডি হার্ট দম্পতি। কলেজ শিক্ষক জোয়েল হার্টের আরও আটটি সন্তানের সঙ্গে মলিও বেড়ে উঠেন অপত্য স্নেহে। পরে তার নাম বদলে হয় শামা মলি হার্ট।

তিনি বলেন, “একাত্তরে মলিদের মতো শিশুদের বলা হত অনাকাঙ্ক্ষিত, শত্রুসন্তান, জারজ সন্তান, অপ্রার্থিত সন্তান। তখন সামাজিক অবস্থান বিবেচনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যাল সার্ভিসকে এ বিষয়ে পরামর্শ প্রদানের অনুরোধ জানান। তিন মাস জরিপের পর সামাজিক অবস্থান বিবেচনায় যুদ্ধ শিশুদের ভিন্ন দেশে দত্তক দেওয়ার পরামর্শ দেয় সংস্থাটি। তখন এগিয়ে আসেন হার্ট দম্পতি। তারা মলিকে দত্তক নেন।”

যুদ্ধ শিশুদের নিয়ে গবেষণার এক পর্যায়ে শামা মলি হার্টের সঙ্গে পরিচয় হয় মোস্তফা চৌধুরীর, তাও প্রায় ২০ বছর আগের কথা। নিজের দেশকে চিনতে আর গর্ভধারিণী মাকে খুঁজে পেতে মলি তখন হন্যে হয়ে উঠেন।

দেশের মাটি ছুঁয়ে দেখার জন্য মলির অনুরোধ রক্ষায় এবার দেশে ফেরার পথে তাকে সঙ্গী করেন বলে জানান গবেষক মোস্তফা চৌধুরী।

মলি বলেন, দুই দিন আগে এসে মাতৃভূমি ও এদেশের মানুষকে তিনি যত দেখছেন, ততই মুগ্ধ হচ্ছেন।

“অন্যরকম এই মানুষগুলো সত্যি ভীষণ ভালো, দেশটা সত্যি চমৎকার, এ দেশটা আমার,” বলতে বলতে কণ্ঠ আসে তার।

পরে মলি শোনান তার বেড়ে উঠার গল্প।

“আমি তরুণ বয়সেই জেনে গিয়েছিলাম মায়ের কথা। শুনেছি একাত্তর সম্পর্কে, জেনেছি আমার জন্ম হয়েছিল কীভাবে। বাবা, মা আমাকে দত্তক নিলেন কীভাবে, এসবও জেনেছি। সত্যি বলি, আমার পরিবার কখনও আমাকে এতটুকু অবহেলা করেনি। আমি জানি না কে আমার মা, কোথায় আমার মা। কিন্তু আমার মা তার আদর থেকে এতটুকু বঞ্চিত করেননি। পুরো পরিবারের স্নেহে আমি বেড়ে উঠেছি।”

কলেজ শিক্ষক বাবা জোয়েল হার্টকে হারিয়েছেন অনেক দিন আগে। বেড়ে উঠার প্রতি ধাপে বাবার অবদানের কথা কৃতজ্ঞতাচিত্তে স্মরণ করেন তিনি।

স্কুলশিক্ষক মলি বলেন তার জন্মদাত্রীকে খোঁজার বৃত্তান্ত: “আমি ইতিহাসের বিভিন্ন নথি, হাসপাতালের কাগজপত্র ঘেঁটে দেখেছি-কোথাও যদি আমার নামটি থাকে! একাত্তরে যারা যুদ্ধশিশুদের দত্তক প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। নিজের নাম কোনো নথিতে পেলাম না। নিজের নামটি খুঁজে পেলে যে আমি আমার মাকেও খুঁজে পেতাম! তবে আশা ছাড়িনি, একদিন হয়ত ঠিক খুঁজে পাব আমার মাকে।”

বাংলাদেশে আবার আসবেন জানিয়ে তিনি বলেন, “এবার হয়ত খুব বেশি দিন থাকা হবে না আমার। তবে আবার আসব, আমি বারবার আসব আমার বাংলাদেশে। আমি মন থেকেই জানি, এটা আমার দেশ। এ দেশেই আমার জন্ম।”

আজ সোমবার মলির সফরসূচিতে রয়েছে অনাথ শিশুদের সঙ্গে প্রহর। অনাথ শিশুদের কোনো একটি আশ্রমে গিয়ে মলি পৌঁছে দেবেন তার ভালোবাসার উপহারসামগ্রী।

এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছিল ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের নানা প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে এক পর্যায়ে মলি বলেন, তিনি তার স্কুলের শিশুদের বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস নিয়ে বলেছেন। মুক্তিযুদ্ধের অনেক ‘অজানা’ ইতিহাস তিনি তুলে ধরতে চান আগামী প্রজন্মের সামনে।

তিনি বলেন, “আমি যুদ্ধের অনেক ইতিহাস জানি না, এখনও অনেক তথ্য আমাকে যোগাড় করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরও বৃহৎ ক্যানভাসে কাজ করতে হবে আমাদের। গণহত্যার প্রভাব, বিস্তার সম্পর্কে আরো অনেক তথ্য নিয়ে আমাদের বিশ্ববাসীকে জানাতে হবে, তাদের সচেতন করতে হবে।”

এই ইস্যুতে বক্তব্য দিতে আসা নুজহাত চৌধুরী শম্পা গণধর্ষণকে ‘গণহত্যার শামিল’ বলেন। একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে সবাইকে একযোগে কাজ শুরু করার আহ্বান জানান তিনি।

শামা মলি হার্টকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান ডা. সারোয়ার আলী।

Scroll To Top

Design & Developed BY www.helalhostbd.net