শিরোনাম
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বিশেষ পাতা

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বিশেষ পাতা

ভাষার মুনাফা, প্রজন্মের আগ্রহ

ফকির ইলিয়াস

ভাষা নিয়ে গর্ব করার মতো অনেক কিছুই আছে। বিশেষ করে সেই ভাষা যদি মানুষের যাপিত জীবনের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। সে ভূমিকাটি কী রকম? তা হচ্ছে এরকম- একজন ইংরেজি ভাষাভাষী আমেরিকান, তার ব্যবসার প্রয়োজনে চীনে গিয়ে চাইনিজ ভাষাটি শিখে নিচ্ছেন। বাংলা ভাষায় কবিতা লিখেছিলেন জীবনানন্দ দাশ। বাংলা ভাষায় গান লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আজ সেই কবিতা, সেই গান অন্য ভাষায় অনূদিত হচ্ছে। পাশ্চাত্যের কোনো প্রকাশনী তা প্রকাশ করে লুটে নিতে চাইছে মুনাফা। সবই হচ্ছে বাণিজ্যের কারণে। ভাষা যদি মুনাফা লাভের সিঁড়ি হয়ে ওঠে, তাহলে তা যে কোনো মহলে আদৃত হবে না কেন ? বাংলাদেশই বাংলা ভাষার চারণভূমি হিসেবে টিকে থাকবে। কথাগুলো বলছেন বাংলা ভাষাভাষী অনেক প্রাজ্ঞজন। অথচ এ বাংলাদেশেই এখন অনেক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। অভিভাবকরা জানেন ও বোঝেন তাদের সন্তানদের বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। ভাষাবিদ্যায় পারদর্শী হওয়ার কথা ভাবলে আমরা যে চিত্রটি প্রথমেই দেখি, তা হচ্ছে একটি অগ্রসরমান প্রজন্মর ভবিষ্যৎ। তা নির্মাণে প্রয়োজন নিরলস অধ্যবসায়। একটি প্রজন্ম শক্তিশালী হয়ে দাঁড়াতে দুটি বিষয়ের প্রয়োজন পড়ে খুব বেশি। প্রথমটি হচ্ছে সৎভাবে সমাজের অবকাঠামো নির্মাণ। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে সমকালের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কর্মপরিধির ব্যাপ্তি ঘটানো। কাজ করতে হলে একটি যোগ্য কর্মীবাহিনীর প্রয়োজন পড়ে, যারা তাদের মেধা ও মনন দিয়ে কাজ করবে নিরন্তর। জ্ঞানার্জনে ভাষা একটি ফ্যাক্টর তো বটেই। কারণ মানুষ না জানলে, সেই তথ্য-তত্ত্ব এবং সূত্রগুলোকে নিজের জীবনে, সমাজজীবনে প্রয়োগ করতে পারে না। সেজন্য প্রয়োজন পড়াশোনা। পড়াশোনা করতে হলে শিক্ষার প্রয়োজন। প্রয়োজন সেই ভাষাটিও রপ্ত করা। বাংলাদেশের নিরক্ষর মানুষ প্রয়োজনীয় অক্ষরজ্ঞান পেলে নিজেদের জীবনমান যেমন বদলাতে পারবেন, তেমনি পারবেন সমাজের চিত্রও বদলে দিতে। একজন শিক্ষিত মা-ই পারেন একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দিতে। আমরা সে কথাটি সবাই জানি এবং মানি। ভাষার যত রকম প্রয়োজনীয়তার সংজ্ঞা আমরা তুলি না কেন, প্রধান কথাটি হচ্ছে একটি জাতিকে শিক্ষিত করে তোলার গুরুত্ব। মানুষ সুশিক্ষিত হলেই তার জ্ঞান খুলবে, সে উদার হবে, সৎ কাজগুলো করবে। এটাই নিয়ম। পাশ্চাত্যে আমরা উচ্চশিক্ষিতের যে হার দেখি, ওই জনশক্তিই রাষ্ট্র গঠন, পরিচালনায় একটি বিশেষ ভূমিকা রাখছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমার এক বন্ধু নিউইয়র্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। পোলিশ এ বন্ধুটির সঙ্গে আমার নানা বিষয়ে কথা হয়। সমাজবিদ্যার এ শিক্ষক আমাকে বারবার বলেন, শক্তিশালী ভাষাই বিশ্বে পুঁজির আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ করছে। তার কথাটি মোটেই মিথ্যা নয়। নিউইয়র্ক তথা গোটা উত্তর আমেরিকার একটি বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা নরটন অ্যান্ড কোম্পানির বেশ কয়েকজন কর্ণধারের সঙ্গে ‘ভাষা ও সাহিত্য’ বিষয়ে আড্ডা দেয়ার সুযোগ হয়েছে। তারা একবাক্যে বলতে চান, মুনাফার লোভেই তারা মহাকবি ওমর খৈয়াম, জালালুদ্দিন রুমী থেকে নাজিম হিকমত, রবীন্দ্রনাথ কিংবা মাহমুদ দারবিশের রচনাবলিকে ইংরেজিতে অনুবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, নিজস্ব আঙ্গিকে। তারা তা ইংরেজিতে ছাপিয়েছেন। বাজারজাত করেছেন। এতে বিশ্বসাহিত্যে এসব মহৎ লেখক যেমন আদৃত হচ্ছেন কিংবা হয়েছেন, তেমনি তাদের বই বিক্রি করে আয় হয়েছে লাখ লাখ ডলারও।
বাংলা ভাষার সন্তান বাঙালি জাতি। জাতিসত্তা থেকে এ চেতনা আমরা কোনো মতেই সরাতে পারব না। পারার কথাও নয়। কিন্তু এই বলে আমরা অন্যভাষা রপ্ত করব না বা করার আগ্রহ দেখাব না; তা তো হতে পারে না। এখানেও অর্থনৈতিক প্রতিপত্তির বিষয়টি আগে আসে খুব সঙ্গত কারণে। ভারতের কেরালা ও তামিলনাড়ু নামে দুটি অঙ্গরাজ্যের কথা আমরা জানি। কেরালা অঙ্গরাজ্যের মানুষ দুটি ভাষা জানেন বিশেষভাবে। একটি কেরালাদের নিজস্ব ভাষা মালেআলাম আর অন্যটি ইংরেজি। সেখানে হিন্দির তেমন দাপট নেই। একই অবস্থা তামিলনাড়ুতেও। তারা তামিল এবং ইংরেজি ভাষায় দক্ষ। বিদেশে চাকরি নিয়ে কেরালা-তামিল থেকে যারা আসেন, দেখলে মনে হয় ইংরেজি যেন তাদের মাতৃভাষাই। তাদের লক্ষ্যটি হচ্ছে, ভাষার আলো গ্রহণ করে একজন দক্ষ আইন প্রফেশনাল কিংবা টেকনোলজিস্ট হওয়া। আর সেজন্য তারা ইংরেজিকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন স্কুলজীবন থেকেই। স্যাটেলাইট টিভির বিভিন্ন চ্যানেলে বাংলাদেশের বইমেলার ওপর অনুষ্ঠানগুলো প্রতিদিনই দেখি। মনে পড়ছে একবার একটি অনুষ্ঠানে দেখেছিলাম, একজন লেখক তার বইয়ের প্রচার করছেন একটি লাইভ অনুষ্ঠানে। তার গ্রন্থের বিষয় কীভাবে আলুর অধিক ফলন করা যায়। বিষয়টি চমকপ্রদ। বর্তমান বিশ্বে আলু চাষের প্রতিযোগিতা চলছে। খাদ্য হিসেবে পাশ্চাত্যে বিভিন্ন আইটেমের আলুখাদ্য জনপ্রিয় হলেও প্রাচ্যে তা জনপ্রিয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমি মনে করি একজন শিক্ষিত কৃষক ক্ষুদ্র আকারে তার নিজের অধিক ফলন অভিজ্ঞতা বিষয়টি হাতে লিখে, কম্পোজ করিয়ে অন্যদের মাঝে বিতরণ করতে পারেন। বিষয়টি ক্ষুদ্র হলেও প্রধান দিকটি হচ্ছে একজন শিক্ষিত কৃষকই তা পারবেন। আর সেজন্যই শিক্ষার বিষয়টি আগে আসছে। শিক্ষিত হলেই মনের প্রখরতা বাড়ে। আর শিক্ষাগ্রহণ করা যায় জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত। প্রতি বছর বাংলাদেশে ভ্রমণবিষয়ক অনেক বই বের হয়। ট্যুরিজম আজকের প্রজন্মের একটি শখের বিষয়। সিলেট কিংবা রাঙ্গামাটিতে কী দেখা যাবে- তা জানতে পারছে তারা ওই বই পড়েই। কয়েক বছর আগে আমরা ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের কয়েকটি কৃষিফার্ম সফর করতে গিয়েছিলাম। ফ্লোরিডায় বেশকিছু ফার্ম আছে, যেগুলোর সব কর্মীই স্প্যানিশ ভাষাভাষী। এরা ইংরেজি একটি অক্ষরও জানেন না। সেখানে কৃষিবিষয়ক সরকারি পুস্তিকাগুলো স্প্যানিশ ভাষায়ই বিতরণ করা হয় সরকারি উদ্যোগে। হ্যাঁ, ভাষার আলো ছড়িয়ে দিতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা উদ্যোগের প্রয়োজন খুবই জরুরি। বাংলাদেশের ভেতরে আদিবাসী ভাষার অনেক কবি, সাহিত্যিক, মনীষী, চিন্তাবিদ, দীক্ষক আছেন যাদের নামটি পর্যন্তও হয়তো আমরা জানি না। তাদের চিন্তাচেতনা যদি বাংলায় রূপান্তরিত হতো তবে বাংলা ভাষাভাষীরা হয়তো তা জেনে উপকৃত হতে পারতেন। একই দেশের ভেতরেই আছে অনেক ভাষা। আর এক বিশ্বে কত ভাষা আছে তা জানার সুযোগ হয়তো সব মানুষের পুরো জীবনেও আসবে না। আমি সব সময়ই রূপান্তরে বিশ্বাস করি। রূপান্তরই হচ্ছে ফিরে আসা, অনূদিত হওয়া কিংবা বিবর্তিত হওয়া। বিবর্তন না হলে নতুনের উন্মেষ ঘটে না। তুলনামূলক আলোচনা ছাড়া জানা যায় না বিশ্বের ভাষার নান্দনিক বিবর্তন কীভাবে ঘটছে। লক্ষ করেছি, চলতি সময়ে বইমেলায় বেশকিছু দুর্লভ প্রাচীন ভাষা ও সাহিত্য যেমন চর্যাপদ, সিলেটি নগরী, আদিবাসী শ্লোক নিয়ে বেশ কাজ হয়েছে। আজকের লেখকরা বাংলা ভাষায়ই লিখছেন ক্যারিয়ার গড়াবিষয়ক বই। ওপরে কীভাবে উঠবেন। চাকরির সিঁড়ি কীভাবে নির্মাণ করবেন। ভাষা প্রয়োজনেই শেখে মানুষ। নিউইয়র্কের একজন নতুন প্রজন্মের বাঙালি-মার্কিন আইনজীবীকে জানি যিনি তার পেশাগত কারণেই শিখে নিয়েছেন বাংলা ভাষা, বাংলা অভিধান তালাশ করে। এগুলো আশার বিষয়। আমি মনে করি এসব উৎস সন্ধানই প্রজন্মকে স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি সাধনের পাশাপাশি ভাষা ও সাহিত্য অঙ্গনেও এগিয়ে যাবে স্বপ্নের বাংলাদেশ। বাংলাদেশে এখন বইমেলা চলছে। বই প্রকাশিত হতে শুরু করেছে লন্ডন, নিউইয়র্ক থেকেও স্থানীয় বাংলা প্রকাশনীর মাধ্যমে। কারণ বাংলা কম্পোজ এখন খুবই সহজ।
বিভিন্ন ভাষার বেশ কিছু অনুবাদগ্রন্থ এরই মধ্যে বেরিয়েছে। বাংলাদেশের প্রকাশকরা অনুবাদ গ্রন্থের প্রতি যত মনোযোগী হবেন, ততই লাভ বাংলা ভাষার। বাংলা সাহিত্যের। মূল কথা হল, সাহিত্যের রস আস্বাদন করা। তা যদি ইংরেজিতেও হয় ক্ষতি কী? ভাষার আলো গ্রহণের একটা প্রতিযোগিতা চলছে আজকের বিশ্বে, নিজেকে টিকিয়ে রাখার কারণেই। বাঙালি প্রজন্ম তা থেকে পিছিয়ে থাকবে কেন? মনে রাখতে হবে, ‘ভাষার অর্থনীতি’ নামে একটি শক্তি এখন প্রজন্মের দরজায় কড়া নাড়ছে। যত জ্ঞান-তত অর্থ, এমন একটা নীতি চালাতে চাইছে পশ্চিমা বিশ্ব। ফলে প্রযুক্তির শক্তির পাশাপাশি ভাষার শক্তিও দিনে দিনে প্রখর হচ্ছে। যে আলো ধারণ করা প্রয়োজন প্রতিটি অগ্রসরমান মানুষেরই।

(ফকির ইলিয়াস : যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক)

এ সময়ের ভাষা প্রশ্ন ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
এ কে এম শাহনাওয়াজ

সপ্তাহ দুই আগে একটি টিভি চ্যানেলের খবরে বর্তমান সময়ের পারিবারিক ভাষা চেতনা নিয়ে একটি রিপোর্ট দেখলাম। এক পরিবারের ৫ থেকে ৭ বছরের দুই শিশু ইংরেজি ভাষায় নির্মিত কার্টুন দেখছিল। মা বলছেন তারা সন্তানদের এসব কার্টুন দেখাতে অভ্যস্ত করাচ্ছেন। কারণ এতে ওদের ইংরেজি শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে। আরেক পরিবারের ৮ থেকে ১০ বছরের দুজন শিশু হিন্দি সিরিয়াল দেখায় অভ্যস্ত। ওরা শোনাল টিভি দেখে দেখে কীভাবে হিন্দি ভাষা রপ্ত করেছে। অবশ্য এতে ওদের বাবা-মা কতটা গর্বিত তা রিপোর্টার দেখাননি। তবে বছর কয়েক আগে আমার এক আত্মীয়াকে গর্ব করে বলতে শুনেছি টিভি সিরিয়াল দেখে এখন ওর মেয়েটি কী চমৎকার হিন্দি বলতে পারে। হিন্দি গান গাইতে পারে। বলিউডের নায়িকাদের মতো নাচের চেষ্টা করে। আমি একটি প্রথম শ্রেণীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে একবার বাংলা ভাষায় লেখা রেফারেন্স বই দিয়েছিলাম। ওর করুণ মুখটা এখনও আমার চোখে ভাসে। দ্বিধা ও হতাশা মিশিয়ে বলেছিল, ‘স্যার আমি বাংলা পড়তে ও লিখতে পারি না।’ এছাড়া পেশা এবং শিক্ষা নির্বিশেষে এখন তো অনেক বাঙালি পরিবার নিজ ছেলেমেয়ের বিয়ের দাওয়াতপত্র ইংরেজি ভাষায় ছেপে বিতরণ করতেই গর্ব বোধ করেন। আমি নিশ্চিত নই ইংরেজি শব্দভাণ্ডার তৈরির জন্য বুদ্ধিমতী মা যখন ইংরেজি ভাষার কার্টুন দেখান সন্তানকে, তিনি ততটা সতর্ক থাকেন কিনা তার সন্তানের মাতৃভাষার শব্দভাণ্ডার কেমন বা শুদ্ধ বাংলা লিখতে পারে কিনা। হিন্দি শেখার পাশাপাশি পরিশীলিত বাংলা অনুষ্ঠান (যদি তেমন অনুষ্ঠান আদৌ প্রচারিত হয়) দেখতে উৎসাহিত করেন কিনা বাংলা ভাষায় দক্ষ হওয়ার জন্য। এসব বাস্তবতা দেখে এবং ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ছড়াছড়ি ও নানা পেশা এবং আয়ের পরিবারগুলোর সন্তানদের এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির হুড়োহুড়ি দেখে আমার সন্দেহ জাগে, এতকাল পরে এসে পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হয় জিতে যাচ্ছে।সাম্রাজ্যবাদী বা সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার শক্তিগুলো জানে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শক্তি একটি দেশের মানুষকে বীর্যবান করে তোলে। যেহেতু সাহিত্য-সংস্কৃতির বাহন ভাষা তাই এই অশুভ শক্তিগুলো আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে নিজভাষা চর্চা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে সচেষ্ট থাকে। তারা জানে মাতৃভাষাচর্চা বিচ্ছিন্ন করতে পারলে। স্বাজাত্যবোধের জায়গাটি দুর্বল হয়ে যাবে। আর আধিপত্যবাদী শক্তির ভাষা যদি এদের ওপর চাপিয়ে দেয়া যায় তবে পরাজিতরা তাদেরই প্রভু মানবে। ফলে মনোবাঞ্ছামতো শোষণ চালিয়ে যাওয়া তেমন কঠিন হবে না।সেই এগারো শতকে ব্রাহ্মণ সেন রাজারা অভিন্ন চিন্তা করেছিল। বিদেশী সেন বংশীয় শাসকরা অন্যায়ভাবে দখল করেছিল বাংলার সিংহাসন। লড়াকু বাঙালির ঐতিহ্যিক শক্তির কথা তারা জানত। তাই বাঙালির প্রতিবাদী সত্তা জেগে ওঠার আগেই তাদের ঐতিহ্যিক শক্তি বিচ্ছিন্ন করতে চাইল। বাংলা ভাষার ওপর আঘাত হানল। এদেশের সাধারণ বাঙালিকে শূদ্র বর্ণভুক্ত করে তাদের জন্য বাংলা ভাষা চর্চা নিষিদ্ধ করে দিল। পরবর্তী বিদেশাগত মুসলমান সুলতানদের মতো উদার শাসকদের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি সেখানেই মুখ থুবড়ে পড়ত। মুসলিম শাসনের ছয় শতাধিক বছর রাষ্ট্রভাষা ফারসি হলেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার দ্বার অবারিত ছিল। ইংরেজ শাসকরা শোষণ চিন্তা মাথায় রেখে এদেশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। তারাও বুঝেছিল বাঙালিকে সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহ্যিক শক্তি বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হলে মাতৃভাষা বিচ্ছিন্ন করতে হবে। কিন্তু ইংরেজরা ছিল বুদ্ধিমান জাতি। তারা বুঝেছিল নানা ভাষায় কথা বলা জাতি বাস করে ভারতজুড়ে। আজ হুট করে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ইংরেজি চাপিয়ে দিলে নানা অঞ্চলেই মানুষ ক্ষুব্ধ হতে পারে। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই ওরা অপেক্ষা করতে চাইল। ওরা বিশ্বাস করেছিল একদিন ভারতবাসীই ইংরেজি ভাষার প্রতি আনুকূল্য দেখাবে। তখন ইচ্ছে পূরণের নীতিনির্ধারণে কষ্ট হবে না। ইংরেজরা জানল ছয় শতাধিক বছর ধরে এদেশের সরকারি ভাষা ফারসি। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ফারসি ব্যবহারে ভারতবাসী অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তাই বুদ্ধিমান ইংরেজরা ভারতবাসীকে বিভ্রান্ত না করে জানিয়ে দিল আগের মতো ফারসিতেই হবে সরকারি কাজকর্ম। নিজেদের সংকট উত্তরণের জন্য সরকারি অফিসে ‘নেটিভ’দের জন্য একটি পদ তৈরি করা হল। যার নাম ছিল ‘মুন্সি’। ভালো ইংরেজি এবং আরবি-ফারসি জানা ভারতীয় এ চাকরি পাওয়ার যোগ্য ছিল। অমন সরকারি চাকরি পাওয়ার আশায় অনেক শিক্ষিত হিন্দু বাঙালি মুসলমান মৌলভীদের কাছে এসে আরবি-ফারসি শিখতেন। এ মুন্সিদের লেখা ও দোভাষী হিসেবে ভূমিকাকে অবলম্বন করে শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করেছিল ইংরেজ শাসকরা। উনিশ শতকের শুরুতে খ্রিস্টান মিশনারি স্যার উইলিয়াম কেরি এবং পরে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, নওয়াব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমির আলী প্রমুখ শিক্ষিত বাঙালির চেষ্টায় এদেশের হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়কে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি মনোযোগী করার জন্য জনমত তৈরি হতে থাকে। এভাবে অনুকূল অবস্থার সৃষ্টি হলে ১৮৩৫ সালে ইংরেজিকে সরকারি ভাষা করা হয়। আর তখন তা সাদরেই মেনে নেয় ভারতীয়রা। প্রায় অভিন্ন উদ্দেশ্য থাকলেও বুদ্ধির দৌড়ে পিছিয়ে পড়া পাকিস্তানি শাসকরা নীতিনির্ধারণে গুবলেট পাকিয়ে ফেলল। পূর্ব ভারতের বাঙালি আর উত্তর-পশ্চিম ভারতের অবাঙালি মুসলমানরা একযোগে পাকিস্তান আন্দোলন করেছিল। ভারত ভাগ হয়ে স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হলেও রাষ্ট্রক্ষমতা চলে যায় অবাঙালি পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। এতে বাঙালি নেতাদের খেদ ছিল না। তারা ভাই বলেই গ্রহণ করেছিল শাসকদের। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের মনে ছিল উর্বর পূর্ব বাংলাকে শোষণ করা। পাশাপাশি হাজার বছরের লড়াকু বাঙালির কথাও তাদের জানা ছিল। দীর্ঘ ঐতিহ্যের প্রেরণা বাঙালির মধ্যে তীব্র স্বাজাত্যবোধ তৈরি করেছে। এ সত্য ঠিক অনুভব করতে পেরেছিল শাসকচক্র। তাই পরবর্তী প্রজন্মের বাঙালিকে মাতৃভাষা চর্চা বিচ্ছিন্ন করতে চাইল। এতেই ঐতিহ্য বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। শাসকদের উর্দু ভাষায় অভ্যস্ত হলে তাদের প্রভু মানতে দ্বিধা থাকবে না। তখন বিনা প্রতিবাদে বাংলাকে শোষণ করতে পারবে। তাই পাকিস্তান জন্মের পর আর অপেক্ষা করতে তর সইছিল না। ১৯৪৭-এর ডিসেম্বরেই বাঙালির ওপর উর্দু চাপিয়ে দেয়ার জন্য কোমর বেঁধে নেমে পড়ল পাকিস্তানি শাসকচক্র। কিন্তু বুদ্ধির দিক থেকে ইংরেজদের চেয়ে পিছিয়ে থাকা পাকিস্তানিরা সোনার ডিমপাড়া হাঁস একবারে জবাই করে সব ডিম পেতে চাইল। একবারও বিবেচনা করল না ছয়-সাতশ বছর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা হয়েছে এ দেশে। তাই বাঙালির বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির শক্তির মূল মাটির গভীরে প্রথিত। পরিবেশ তৈরি না করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চাইলে প্রতিবাদতো হবেই। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির শক্তিই শেষ পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনকে সফল করেছিল। অনেককাল পর প্রায় অভিন্ন উদ্দেশ্যে আবার আগ্রাসন চিন্তায় বাংলা ভাষার ওপর আক্রমণ শুরু হয়েছে। এটি এক ধরনের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের যুগ। পাশ্চাত্য দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নানাভাবে অর্থনৈতিক শোষণ করতে তৎপর। সামরিক শক্তিবলয় তৈরি করতে কোনো কোনো দেশ চায় এসব দেশকে অবলম্বন করে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে বড় বাধা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ দেশগুলোর মানুষের স্বাজাত্যবোধ। তারা প্রতিবাদী হয় বলে আগ্রাসনবাদীদের লক্ষ্যপূরণ কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে বিশ শতকের পাকিস্তানিদের মতো করে নয় আঠার-উনিশ শতকের ইংরেজ ঔপনিবেশিক নেতাদের মতো করে ধীরে ধীরে প্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিচ্ছিন্ন করতে চাইছে। এসব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পথ ধরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল। শুধু উচ্চবিত্ত নয়, মধ্যবিত্ত ও নিুমধ্যবিত্ত অনেক পরিবারের মধ্যে ইংরেজি মাধ্যমে সন্তানকে পড়ানোর মিথ্যা আভিজাত্যের লোভ ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। মাঝারি বড় সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার মাধ্যম রাখা হয়েছে ইংরেজি। মেধা ও পরিচর্যা দুই বিচারেই এসব শিক্ষার্থীর বড় অংশ না বাংলা না ইংরেজি কোনো ভাষাতেই দক্ষ হয়ে উঠতে পারছে না। এসব শিক্ষার্থীর বড় অংশ শুধু বাংলা সাহিত্য এবং বাংলা ভাষায় লেখা বইপড়া ও সংস্কৃতিচর্চা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে তাই নয়, ইউটিউব আর ফেসবুক সংস্কৃতিতে জড়িয়ে সংবাদপত্র পড়াও ভুলে যাচ্ছে। পাশ্চাত্য শক্তির এ অশুভ তৎপরতার সহায়ক বন্ধু হয়ে দেখা দিয়েছে আমাদের অনেক টিভি চ্যানেল ও বেসরকারি রেডিও চ্যানেল। এখানে তারুণ্যের ক্রেজ বলে এক অদ্ভুত দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলা ‘দর্শক’ শব্দ ভুলিয়ে ‘হাই ভিউয়ার্স’ সংস্কৃতির কর্ষণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষায় অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের বড় অংশ পড়ছে কওমি ধারার মাদ্রাসায়। সেখানেও মাতৃভাষা চর্চার জায়গাটি ভীষণ সংকুচিত। ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ও কওমি মাদ্রাসা শিক্ষায় দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানার সুযোগ নেই বললেই চলে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চার দীর্ঘ ঐতিহ্য বাঙালিকে আত্মশক্তিতে বলীয়ান করেছিল। তাই আমাদের পুর্বসূরিরা জীবনপণ করে ভাষার লড়াইয়ে পথে নামতে পেরেছিলেন। কিন্তু এ সময়ে এসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর যেভাবে আগ্রাসন চলছে এবং তা আমরা যেভাবে নীরবে মেনে নিচ্ছি তাতে বাঙালির একটি বিপর্যস্ত ছবিই ভেসে উঠছে। ভাষা আন্দোলনের স্বাতন্ত্র্য ধারণ করা প্রভাতফেরিকে কোনো প্রতিবাদ ছাড়া যেভাবে ‘মধ্যরাতের প্রভাতফেরি’ বানিয়ে দিয়েছি, তাতে বোঝা যায় আগ্রাসনবাদী পাশ্চাত্য শক্তি কতটা অগ্রসর হতে পেরেছে। দুঃখ হয় এই ভেবে যে, অগ্রজরা ভাষার লড়াই করে আমাদের আত্মমর্যাদাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ করে আত্মপরিচয়কে সুনির্দিষ্ট করেছিলেন, যে গৌরবের পথ ধরে ২১ ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পেয়েছে, তাদেরই উত্তরসূরি হয়ে আমরা অবলীলায় মাতৃভাষাকে অসম্মানিত করে নিজেদেরই পরাজিত করছি।
(ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়)

মাতৃভাষার আন্তর্জাতিক সম্মানের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে
ড. সাদত হুসাইন

দিনটি ছিল ১২ নভেম্বর ১৯৯৯। ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ সম্মেলনের কমিশন-২-এর অধিবেশন চলছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব উত্থাপিত হবে। আগের দিনই প্রস্তাবটি উত্থাপনের কথা ছিল; কিন্তু সময় স্বল্পতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে আমরা যারা ছিলাম, প্রস্তাবের পরিণতি কী হতে পারে তা নিয়ে সবাই ছিলাম উত্তেজিত ও উদ্বিগ্ন। বেশ কিছুদিন ধরে এ নিয়ে জোরালো লবিং চলে আসছিল। শিক্ষামন্ত্রী এএসএইচকে সাদেক ছিলেন এর নেতৃত্বে। প্রতিনিধি দলের প্রধান হিসেবে তিনি তার বক্তৃতায় একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছিলেন এবং দিবসটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করার জন্য অন্য দেশের প্রতিনিধিদের আবেদন জানাচ্ছিলেন। কমনওয়েলথের সদস্য দেশগুলোর সমর্থন আদায়ের জন্য প্যারিসের বাংলাদেশ দূতাবাসও কঠোর পরিশ্রম করছিল। ফলে পাকিস্তানসহ ২৮টি দেশ বাংলাদেশের প্রতি আনুষ্ঠানিক সমর্থন দিতে সম্মত হয়। প্রায় দশ দিন প্যারিসে অবস্থান করে শিক্ষামন্ত্রী দেশে ফিরে আসেন। পরে প্রতিনিধি দলের উপপ্রধান হিসেবে আমার পালা আসে সেখানে দলের সঙ্গে যোগ দেয়ার। প্যারিস সম্মেলনে যোগদানের প্রাক্কালে মন্ত্রী প্রস্তাবটি সম্পর্কে আমাকে ব্রিফ করেন এবং কিছু কিছু মহল থেকে বাড়তি অর্থনৈতিক বোঝা চাপার অজুহাত দেখিয়ে প্রস্তাবটির বিরোধিতা আসা সত্ত্বেও তিনি যথেষ্ট আশাবাদী ছিলেন যে, প্রস্তাবটি সম্মেলনে গৃহীত হবে। পরে ঢাকায় বসেও তিনি নিয়মিত এর কতদূর কী হল, সে বিষয়ে খোঁজখবর রেখেছেন। কমিশন-২-এর অধিবেশনে প্রস্তাবটি পেশ করার নির্ধারিত সময়ের কয়েক মিনিট আগে আমাকে প্লেনারিতে যেতে হয় ইউনেস্কোর মহাসচিব নির্বাচনে ভোট দেয়ার জন্য। ফ্রান্সে আমাদের রাষ্ট্রদূত এবং ইউনেস্কোয় স্থায়ী প্রতিনিধি সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল প্রস্তাবটি কমিশনে উপস্থাপনের। আমি খুব চিন্তিত ছিলাম যে, প্রস্তাবটি উত্থাপনের এরকম একটি মুহূর্তে আমি হয়তো উপস্থিত থাকতে পারব না। কিন্তু ভাগ্য আমার প্রতি সুপ্রসন্ন ছিল। তাই অন্যান্য প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘায়িত হওয়ায় আমাদের প্রস্তাবটির উত্থাপন কিছুটা বিলম্বিত হয়। ফলে সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী প্রস্তাবটি কমিশন-২-এর সামনে উত্থাপনের আগেই আমি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে যোগ দেই। প্রতিনিধি দলে আমি ছাড়া অন্যদের মধ্যে ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক সাইদুর রহমান, বাংলাদেশের ইউনেস্কো জাতীয় কাউন্সিলের সচিব অধ্যাপক কফিল উদ্দিন আহমদ এবং ফ্রান্সে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর ইকতিয়ার চৌধুরী।
এছাড়া ইউনেস্কো মহাপরিচালকের বিশেষ উপদেষ্টা টনি (তোজাম্মেল) হকও আমাদের সঙ্গে ছিলেন। রাষ্ট্রদূত মোয়াজ্জেম আলী তার কাজটি ঠিকমতোই করছিলেন। আমাদের সঙ্গে ব্যাপক শলাপরামর্শের মাধ্যমেই তিনি তার বিবৃতিটি তৈরি করেছিলেন। বিবৃতিতে তিনি যোগাযোগের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে এবং নিজেকে ব্যক্ত করার উপায় হিসেবে মাতৃভাষার গুরুত্বের ওপর আলোকপাত করেন। তিনি লেখেন, ভাষা সমাজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মর্মমূলে প্রোথিত। মাতৃভাষায় কথা বলা ও লিখতে পারার অধিকার এক অবিচ্ছেদ্য অধিকার, যা আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করতে এবং শান্তির সংস্কৃতিকে জাগ্রত করতেই সংরক্ষণ করা একান্ত প্রয়োজন। পৃথিবীর অনেক ভাষা হারিয়ে গেছে এবং অনেক ভাষার অস্তিত্বও আজ হুমকির মুখে। কাজেই আমরা যদি মাতৃভাষার গুরুত্বকে স্বীকৃতি না দেই, তাহলে জনগণের মত প্রকাশের অধিকার বাস্তবায়িত হবে না এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সম্ভাবনাও হারিয়ে যাবে। বিশ্বের বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায় তাদের মাতৃভাষা রক্ষায় সংগ্রাম করেছে, তবে মাতৃভাষার জন্য বাংলাদেশের সাহসী ছেলেদের জীবনদান ও সাফল্য এ ক্ষেত্রে আলাদা মর্যাদার দাবি রাখে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) ভাষা আন্দোলনে শহীদরা ঢাকার রাজপথে নিরাপত্তা বাহিনীর বুলেটে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেয়। বিশ্বের ভাষা ও যোগাযোগের ইতিহাসে এ ঘটনা বিশেষ স্বীকৃতির দাবি রাখে। সুতরাং জীবনের বিনিময়ে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি যারা মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষারূপে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মাতৃভাষাকে রক্ষা করে গেল, তাদের সে আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে সারা বিশ্বে দিনটিকে যৌক্তিক কারণেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা উচিত। বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল সদস্য দেশগুলোর কাছে যোগাযোগের মাধ্যম ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে মতৃভাষার প্রতি যথাযথ মর্যাদা জ্ঞাপন করার পথ হিসেবে এ প্রস্তাবের প্রতি তাদের সমর্থন জানানোর অনুরোধ জানায়। প্রস্তাবে এও বলা হয় যে, প্রতিটি দেশ যেহেতু নিজের মতো করে দিবসটি পালন করতে পারবে, কাজেই এজন্য অতিরিক্ত ব্যয়ের কোনো প্রয়োজন হবে না। সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের প্রস্তাব মেনে নেন। একজনও এর বিরোধিতা করেননি, এমনকি কেউ কোনো সংশোধনীও আনেননি। ফলে কমিশনে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এরপর বাকি থাকে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তা সম্মেলনের প্লেনারিতে পেশ করা। ততক্ষণে আমরা জেনে গেছি, প্রধান বাধাটি আমরা অতিক্রম করে ফেলেছি। প্লেনারিতে পেশ করা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। যা হোক, প্লেনারি অনুষ্ঠানের জন্য আমাদের ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল। ইতিমধ্যে আমরা কমিশন-২-এর খসড়া রেজুলেশনটি যথাযথভাবে লেখা হয়েছে কি-না তা নিশ্চিত করে নিলাম। অন্যদিকে ঢাকায় শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সার্বক্ষণিকভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে তার পরামর্শ নিচ্ছিলাম। প্রস্তাবের কোনো শব্দ বা বাক্যে ভুল রইল কি-না সে ব্যাপারে জানার জন্য কমনওয়েলথ মহাপরিচালকের কার্যালয় ও সচিবালয়ের মধ্যে জোর লিয়াজোঁ রক্ষা করছিলেন টনি হক। শেষ মুহূর্তেও যাতে কোনো ধরনের ঝামেলা না দেখা দেয়, সেজন্য সব ধরনের পূর্বসতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছিল। সর্বশেষ এলো ১৭ নভেম্বর ’৯৯। আমাদের বহু কাক্সিক্ষত সেই চূড়ান্ত মুহূর্তটি। কমিশন-২-এর চেয়ারম্যান বিভিন্ন খসড়া প্রস্তাবসহ তার রিপোর্ট উপস্থাপন করলেন সাধারণ সম্মেলনে পাস করানোর জন্য। খুব কম সময় আলোচনা চলল এবং সর্বসম্মতিক্রমে সব প্রস্তাব পাস হয়ে গেল। ইউনেস্কো সাধারণ সম্মেলনের ৩০সি/ডিআর ৩৫ প্রস্তাবে লেখা হল- ‘২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসরূপে পালনের ব্যাপারে সাধারণ অধিবেশনের ঘোষণা এখন থেকে ইউনেস্কোর সাধারণ অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হল।’ সঙ্গে সঙ্গেই সংবাদ পাঠিয়ে দেয়া হল দেশে। শিক্ষামন্ত্রী এএসএইচকে সাদেক তাৎক্ষণিকভাবে সংবাদ সম্মেলন ডেকে সংবাদপত্রগুলোকে সুখবরটি জানিয়ে দিলেন। আমরা প্রতিনিধি দলের সদস্যরা ইউনেস্কো সদর দফতরের কাছে ক্যাথি রয়্যাল রেস্তোরাঁয় মধ্যাহ্ন ভোজ খেয়ে সেলিব্রেট করলাম। টনি হক আমাদের সঙ্গে ছিলেন। এটা ছিল একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এমন একটি ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত থাকতে পেরে আমি ছিলাম উচ্ছ্বসিত। এ ধরনের কোনো ঘটনায় অংশ নিতে পারলে যে কেউই নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করবে। যা হোক, এবার একটু পেছনে ফিরে যাই। বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক মর্যাদাদানের এ ঐতিহাসিক ও অনন্য সাধারণ প্রক্রিয়াটির সূচনা করেছিলেন কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশীরা। বাংলাদেশ ডেলিগেশন সেটি ইউনেস্কোর ৩০তম সম্মেলনে উত্থাপন করে এবং সাফল্য পায়। কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশীদের এ উদ্যোগের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রফিকুল ইসলাম, যার নাম এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। এরকম একটি ঐতিহসিক মুহূর্তে আমি খানিকটা আনমনা হয়ে উঠি। স্মৃতিতে ভেসে ওঠে ১৯৫২ সাল ও তার পরবর্তী সময়ের কথা। একটি জেলা শহরে তখন আমি দ্বিতীয় গ্রেডের ছাত্র। বুঝতাম না মাতৃভাষা কী, আর এর গুরুত্বই বা কী। যেটুকু মনে আছে তা হচ্ছে, ঢাকায় কয়েকজনকে মেরে ফেলা হয়েছে এবং চারদিকে তাই নিয়ে কথাবার্তা চলছে। এ সময় আমাদের স্কুল বন্ধ করে দেয়া হয়। আমাদের উপরের শ্রেণীর ছাত্রদের বাংলা ভাষার পক্ষে স্লোগান দিতে শুনেছি, যা আমি খুব কমই হৃদয়ঙ্গম করতে পারতাম। ১৯৬২ সালে আমি যখন ঢাকা কলেজের ছাত্র, তখন ছাত্র রাজনীতির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠি। তখন শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে দেশে তোলপাড় চলছিল। আমরা রিপোর্টের বিরোধিতা করে ঢাকার রাস্তায় বিক্ষোভ করেছি, ফলে সরকার তা বাতিল করতে বাধ্য হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আমি ছাত্র রাজনীতির একজন কর্মী হয়ে যাই। তখনই ভাষা দিবসের গুরুত্ব আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। আমি বুঝতে পারি মাতৃভাষা রক্ষায় একুশের শহীদরা কীভাবে নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন। তখন থেকেই গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে আমি দিবসটি পালন করে আসছি। কখনও বন্ধুদের সঙ্গে, কখনও সতীর্থদের সঙ্গে, কখনও ব্যক্তিগতভাবে। বড় হয়ে আমি উপলব্ধি করলাম, একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর মধ্য দিয়ে আমাদের অস্তিত্ব সংরক্ষিত হয়েছে। সব গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় আন্দোলনে একুশে ফেব্রুয়ারি হয়ে উঠেছে আমাদের আশা ও উদ্দীপনার প্রদীপ। পরবর্তী সময়ে সব ধরনের অত্যাচার, অবিচার, বৈষম্য ইত্যাদির বিরুদ্ধে সংগ্রামে উদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে এ ভাষা আন্দোলন। একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনা এখন মাতৃভাষার পরিধি অতিক্রম করে সব পর্যায়ে মানবাধিকার বাস্তবায়ন করার একটি শক্তিশালী মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। মাতৃভাষা আন্দোলনের এ চেতনা থেকেই আমরা যে কোনো অবিচার ও মানবাধিকার লংঘনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার উদ্দীপনা পেয়েছি। এছাড়াও কোনো বৈধ দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সাধারণ মানুষ যখন সংগ্রাম করে, তখন তাদের মনোবল হিসেবে কাজ করে এ ভাষা আন্দোলনের চেতনা। প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাঙালিরা গভীরভাবে এর তাৎপর্য অনুভব করে এবং আবেগঘন দৃঢ়তায় দিবসটি পালন করে। তারা তাদের অস্তিত্বের নতুন অর্থ খুঁজে পায় এবং এক বছর পর আরও একটি একুশে ফেব্রুয়ারি আসার প্রতীক্ষা করে। এটাই হচ্ছে মাতৃভাষার শক্তি। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এর আগে দিবসটির সম্মানে একমাত্র সঠিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল, তা হচ্ছে এটিকে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলা। দিবসটিকে আরও বিশেষ কোনো মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়োজন ছিল। সে লক্ষ্যেই ছিল আমাদের প্রচেষ্টা। আমাদের সবার মিলিত প্রয়াসকে ধন্যবাদ যে, বিশ্ব এখন আমাদের মাতৃভাষা রক্ষা তথা মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার সংগ্রামকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য প্রাণ দিয়েছেন সালাম, জব্বার, রফিক, বরকত। এভাবে তারা এখন হয়ে গেছেন আমাদের জীবনের অংশ আর দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে আমরা হয়েছি ইতিহাসের অংশ। আমাদের প্রজন্ম এ নিয়ে গর্ব করতে পারে।গত সহস্রাব্দ শেষ হওয়ার আগেই আমাদের মাতৃভাষার দাবিতে আত্মাহুতিদানকারী শহীদের মিলেছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। অবশ্য এর আগে এমন অনেক আত্মত্যাগের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলেছে। কারণ সেগুলো ছিল উন্নত দেশগুলোর ঘটনা। আর মাতৃভাষার জন্য আমাদের সংগ্রাম ও ত্যাগের স্বীকৃতি মিলতে মিলতে পার হয়ে গেল ৪৭ বছরেরও বেশি সময়। যা হোক, তবুও আমরা তা পেয়েছি। সর্বোচ্চ অঙ্গীকার ও নিরলস সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে রক্ষা করেছি, স্বাধীনতা অর্জন করেছি এবং সর্বশেষে আমরা আমাদের মাতৃভাষা ও তার জন্য যে আত্মোৎসর্গ, তার স্বীকৃতি পেয়েছি। মনে হচ্ছে, আমরা নতুন সহগ্রাব্দটি দৃঢ়তার সঙ্গে এবং আরও বেশি প্রত্যাশাকে পুঁজি করে বেঁচে থাকার অধিকার অর্জন করেছি।
(ড. সা’দত হুসাইন : সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান)

মাতৃভাষা বাংলার চর্চা হোক সর্বত্র এবং সার্বজনীন
সৈয়দা গুলশান ফেরদৌস জানা

মাতৃভাষা হচ্ছে মানুষের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং কৃষ্টির পরিচয় জ্ঞাপক। সন্তানের জন্যে মায়ের অস্তিত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, মানুষের সুস্থভাবে প্রকাশিত হওয়ার জন্যে, বিকশিত হওয়ার জন্যে মাতৃভাষারও তেমনি বিকল্প নেই। বিশ্বজুড়ে সকল মাতৃভাষাই শ্রদ্ধার, ভালবাসার এবং সম্মানের। বাঙালির জীবনে মাতৃভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠায় যে অনন্য গৌরবময় ইতিহাস জড়িয়ে আছে, যে মূল্যবান আত্মত্যাগ মিশে আছে তা বোধকরি বিশ্বে আর কোথাও নেই। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে বাঙালির সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ একদিকে যেমন আমাদের মাতৃভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে তেমনি পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেরণা, অসীম শক্তি ও সাহসের সূচনা করে দিয়েছে, বাঙালিকে আত্মবিশ্বাসী, দৃঢ় আর সুসংবদ্ধ হতে উজ্জীবিত করেছে। মাতৃভাষার জন্যে এমন গৌরবমণ্ডিত আন্দোলন এবং অর্জনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বরে জাতিসংঘ ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। ভাষা, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি সম্পর্কিত বিষয়ে শ্রদ্ধা ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিনটি বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। আমাদের এই পাওয়া বড় মর্যাদাময় আত্মত্যাগের ফসল। আমাদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য মাতৃভাষা বাংলাকে যোগ্য মর্যাদার সাথে ব্যাপক চর্চা, সুষ্ঠু পরিচর্যা ও ঘরে-বাইরে সর্বত্র প্রচলন নিশ্চিত করা।শিশুর মুখে বোল ফোটে মায়ের কোলে, মায়ের ভাষাতেই। তাই যতেœর সাথে মাতৃভাষাটি শিশুর মনে এবং মস্তিষ্কে গেঁথে দেয়ার প্রথম দায়িত্বটি মায়েরই। মা-বাবা এবং পরিবারের অন্যদের সচেতনতায় একটি শিশু মাতৃভাষায় দক্ষ হয়ে ওঠে, নিজস্ব সংস্কৃতি, কৃষ্টি এবং সঠিক ইতিহাস বিষয়ে সম্যক ধারণা পায়। সত্যিকারের ব্যক্তিত্ব বিকাশ, দেশপ্রেম ও স্বদেশের প্রতি দায়বদ্ধতা শিখে বেড়ে ওঠে। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, এখন অনেক মা-বাবাই সন্তানের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের স্বপ্নে মাতৃভাষার পরিবর্তে ইংরেজি শিক্ষাকেই প্রাধান্য দেন এমন কি সঠিকভাবে বাংলা বলতে, পড়তে এবং লিখতে না পারা বা ইংরেজি বাংলার মিশ্রণে ইংরেজি কায়দায় কথা বলায় গৌরববোধ করে, উত্সাহিত করে। ফলে দু’টি ভাষার কোনটিই পরিপূর্ণভাবে শেখা হয়ে ওঠে না। এতে যে বড় ক্ষতিটা হয় তা হলো নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি অনীহা এবং মাতৃভাষার স্থলে আরোপিত এক বিচিত্র মিশ্র ভাষার চর্চার আগ্রাসন। ভাষা বিশ্বময় যোগাযোগের সেতু। মাতৃভাষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজি বা ভিন্ন ভিন্ন ভাষা শিক্ষা এবং পারদর্শিতা হাজারো সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। বিশ্বের সাথে যোগাযোগের পথ প্রসারিত হয়, মানুষ আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠে। তবে ভাষার ভিতটি হচ্ছে মাতৃভাষা। মানুষ তখনই ভিন্ন একটি ভাষায় পারদর্শিতা আনতে বিশেষভাবে সক্ষম হয় যখন সে তার মাতৃভাষাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে, মর্যাদার সাথে রপ্ত করে, চর্চা করে এবং পরিচর্যা করে। পৃথিবীর সপ্তম বৃহত্তম ভাষা হলো আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরাসহ বিশ্বজুড়ে পঁচিশ কোটিরও কিছু বেশি মানুষ বাংলায় কথা বলে। এর মধ্যে বাইশ কোটি মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হলেও বাকি তিন কোটি মানুষ কেবল ভালবেসে শিখে নিয়েই বাংলাকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে চর্চা করে। সেখানে বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা হওয়া সত্ত্বেও এমন অবজ্ঞা কেন! অবহেলা কেন! পাঁচ পাঁচটি যুগ পেরিয়ে যাবার পরেও আমরা মাতৃভাষা বাংলাকে সেই যোগ্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি! এ বড় পরিতাপের বিষয়। আমাদের সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত হওয়া উচিত। পারিবারিক এবং সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় জোরালো উদ্যোগে আমাদের সেই ১৯৫২’র আবেগ, দেশপ্রেম, আত্মমর্যাদাবোধ আর শহীদের রক্তে রাঙা ২১ ফেব্রুয়ারির প্রতি সত্যিকারের ভালবাসা, শ্রদ্ধাবোধ অক্ষুণœ রাখা সম্ভব। গৌরবমণ্ডিত মাতৃভাষা বাংলার জন্যে ভাষাশহীদ এবং ভাষাসৈনিকদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতা।
(লেখক : পরিচালক, সামহোয়্যার ইন ব্লগ)

ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ

১৯৫২ সালে আমি চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। আমার গ্রামের বাড়ি থেকে এক মাইল দূরে একটি হাইস্কুল। নাম খোর্দকোমরপুর হাইস্কুল। এর সঙ্গে প্রাইমারি শাখা ছিল। ১৯৫২-এর ফেব্রুয়ারি মাসের ২২/২৩ তারিখ হবে হয়তো। সিনিয়র ক্লাসের ছেলেরা এসে বলল ক্লাস হবে না। ঢাকায় পুলিশ ছাত্রদের গুলি করে মেরে ফেলেছে। মিছিল করতে হবে। ঘটনার গুরুত্ব যে বুঝেছি তা বলব না। তবে সবাই মহাআনন্দে মিছিলে যোগ দিয়ে গ্রাম প্রদক্ষিণ করলাম। মিছিলের দুটো স্লোগান খুব ভালোভাবে মনে ছিল ১. রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই ২. নুরুল আমিনের কাল্লা (মাথা) চাই। তখন নুরুল আমিন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সহযোগী। ১৯৭১-এর গণহত্যার খলনায়ক ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়ার মন্ত্রিসভার ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি বাংলাদেশে ফেরেননি। পাকিস্তানে মৃত্যুবরণ করেছেন। ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার দাবিতে ছাত্রদের গুলি করে বাংলা ও বাঙালি বিদ্বেষের যে পরিচয় তিনি দিয়েছিলেন তার সেই ‘আদর্শের’ প্রতি তিনি আমৃত্যু নিষ্ঠাবান ছিলেন। ফিরে আসি গ্রামের মিছিলের প্রসঙ্গে। সেদিন হাটবার, স্থানীয় হাট বসার কথা। ছাত্ররা হাটে আগমনকারী সবাইকে আহ্বান জানালেন হাটে না বসার জন্য। তারা কোনো প্রতিবাদ না জানিয়ে বরঞ্চ পরোক্ষ সমর্থন জানিয়ে ফিরে গেলেন। বেশ কয়েকদিন এই মিছিল চলেছিল। আমাদের গ্রামের নাম মিনিকপাড়া। গাইবান্ধা মহকুমা শহর (বর্তমানে জেলা) থেকে ১০ মাইল দূরে। যোগাযোগ বলতে কাঁচা সড়ক। গরুর গাড়ি এবং সাইকেল ছাড়া আর কোনো বাহন ছিল না। এহেন নিভৃত পল্লীতে যখন ভাষা আন্দোলনের জোয়ারের ঢেউ আঘাত হেনেছিল তখন নিশ্চিত করে বলা যায় গোটা দেশ এই আন্দোলনে আলোড়িত হয়েছিল- এক কথায় বলা চলে সর্বস্তরের জনগণ এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছিল।
ভাষা আন্দোলনের পটভূমি প্রথমে আলোচনা করা দরকার। যখন পাকিস্তানের জন্ম অবধারিত হলো অর্থাৎ ব্রিটিশরা সিদ্ধান্ত নিল যে, ভারতকে ভাগ করে মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান এবং বাকি জাতির জন্য ভারত- এই দুই দেশের ওপর দায়িত্বভার বুঝিয়ে দেবে, তখন অর্থাৎ ১৯৪৬-৪৭ সালে একদল বেকুব বুদ্ধিজীবী গবেষণা শুরু করলেন যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, এর নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. জিয়াউদ্দীন। সম্মানিত পাঠক, বেকুব এ কথাটা এ জন্য বলছি যে, রাষ্ট্রের জনগণ যে ভাষার কথা বলে সেটা তার মাতৃভাষা তথা রাষ্ট্রভাষা। তবে প্রয়োজনবোধে একাধিক রাষ্ট্রভাষা হতে পারে কিন্তু মাতৃভাষার বিনিময়ে নয়। যাহোক ড. জিয়াউদ্দীন গং রায় দিলেন যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হতে হবে উর্দু। অথচ পূর্ব বাংলা তো নয়, এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশের কোনোটিতে উর্দু মাতৃভাষা ছিল না। জ্ঞানতাপস ড. শহীদুল্লাহ অবশ্য এর প্রতিবাদ জানিয়ে নিবন্ধ লিখে বলেছিলেন যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ ভাগ আমরা বাঙালি। শেষ পর্যন্ত আমাদের মুখের ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে তরুণদের বুকের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করতে হয়েছিল। পৃথিবীতে এটি যেমন অনন্য সাধারণ ঘটনা যে নিজের মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিতে হয়েছে, তেমনি ‘অনন্য অসাধারণ’ ঘটনা যে, তৎকালীন গণপরিষদে বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও বাংলা ভাষার জন্য প্রস্তাব করা হয়নি। ধিক সেই সংসদকে, ধিক সেই সদস্যদের। এটা আবেগের কথা নয়, ইতিহাস দাবি করে তাদের ধিক্কার জানাতে হবে। ১৯৪৮ সালে করাচিতে যখন গণপরিষদের অধিবেশন চলছিল, তখন ইংরেজি এবং উর্দুতে পরিষদের কর্মসূচি দেখে পূর্ব বাংলার সদস্য শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত একটি প্রস্তাব আনলেন যে, উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও স্বীকৃতি দেয়া হোক। এ প্রস্তাবটি তিনি এনেছিলেন ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। সে সময় গণপরিষদের মোট সদস্য সংখ্যা ৭৪। এর ভেতর পূর্ব পাকিস্তানের সদস্য ছিল ৪৪। অতএব বাংলার অনুকূলে প্রস্তাব নেয়ার কোনো বাধা থাকার কথা নয়। অথচ কী লজ্জার কথা যে, প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়। সমস্যাটা কোথায় ছিল? প্রথমত, বাংলার মুসলমানরা পরিচয় সংকটে ভুগছিলেন। একই সঙ্গে বাঙালি এবং মুসলমান থাকা যায়, এটা অনেকের মাথায় হয়তো ঢুকেনি। তাছাড়া কয়েকজন সদস্য যেমন খাজা নাজিমুদ্দীন, ফজলুর রহমান, এরা মনেপ্রাণে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি বিরোধী। এদের সম্পর্কে বোধহয় সতের শতাব্দীর বাঙালি মুসলমান কবি আব্দুল হাকিমের কথা প্রযোজ্য। তিনি বলেছেন, ‘যেসব বংগেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’। তৎকালীন মুসলমান রাজনীতিকরা যদি এটুকু বুঝতেন যে, বাংলা ভাষার উন্নতি শুধু হিন্দু দিয়ে হয়নি; বাংলার লোকগীতিতে উভয় সম্প্রদায়ের অবদান রয়েছে; কবি নজরুল, শেখ ফজলুল করিম, মীর মশাররফ হোসেন এদের অসাধারণ অবদান বাংলা ভাষায়; এখন পর্যন্ত বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ এলিজি বা শোকগাথা, কবি জসীমউদ্দীনের- তাহলে তারা হয়তো বিভ্রান্ত হয়ে এই অপকর্মটি করতেন না। গণপরিষদে বাংলার পক্ষে প্রস্তাব গৃহীত না হওয়ায় জনাব মোহম্মদ আলী জিন্নাহ আরো বেশি উৎসাহবোধ করেছেন একমাত্র উর্দুর রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা দেয়ার। জনাব জিন্নাহ একই বছরের ২১ মার্চে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন একমাত্র উর্দু, উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। উভয় স্থানে বঙ্গবন্ধুসহ তরুণ ছাত্রনেতারা না না বলে প্রতিবাদ করেছিলেন। সে সময় জিন্নাহর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। তাই হয়তো প্রতিবাদ যতটা তীব্র হওয়ার কথা তা হয়নি। তবে প্রতিবাদ তো হয়েছিল। জনাব জিন্নাহ অসম্ভব ক্ষমতালোভী ছিলেন। তিনি একই সঙ্গে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল, নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট এবং গণপরিষদের প্রেসিডেন্টের পদ আঁকড়ে ধরেছিলেন। এতে বোঝা যায় যে, আর যাই হোক না কেন তিনি গণতন্ত্রমনা ছিলেন না। তাহলে ভাষার বিষয়টা এভাবে চাপিয়ে দিতেন না। ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ সাহেবের এরকম কথার পর বাংলার ছাত্রসমাজ আরো সচেতন হয়ে উঠলেন। তারা বুঝতে পারলেন যে, বিষয়টি নিয়ে সংগ্রাম করতে হবে। ১৯৫০ সালের ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এর আহ্বায়ক ছিলেন আব্দুল মতিন। তিনি ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িত ছিলেন যে, তিনি এখন ‘ভাষা মতিন’ নামে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে খ্যাত। ১৯৫২ সালের শুরু থেকে ভাষা আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিতে থাকে। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন করাচি থেকে ঢাকায় আসেন। তিনি পল্টন ময়দানে এক জনসভায় বলেন যে, প্রদেশের সরকারি কাজকর্মে কোন ভাষা ব্যবহৃত হবে তা প্রদেশের জনগণই ঠিক করবে। কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে কেবল উর্দু। সঙ্গে সঙ্গে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। ৩১ জানুয়ারি ১৯৫২তে আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধিদের সভায় ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীর রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয় যার আহ্বায়ক হন কাজী গোলাম মাহবুব। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল, জনসভা ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়। সরকার এসব নিষিদ্ধ করে সমগ্র ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে। ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ আলোচনা সভায় বসে। কিন্তু অধিকাংশ সদস্য ১৪৪ ধারা জারিতে আতঙ্কিত হয়ে এটি না ভঙ্গ করার পক্ষে মত দেন। তখন ছাত্রনেতারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেন। এতে ছিলেন আব্দুল মতিন, গাজীউল হক, অলি আহাদসহ আরো অনেকে। পরদিন অর্থাৎ ২১ জানুয়ারি ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করার চেষ্টা করলে পুলিশ গুলি চালায়। শহীদ হন বরকত, সালাম, রফিক, শফিক এবং আরো অনেকে। তাদের এ আত্মত্যাগ ভাষা আন্দোলনকে আরো বলীয়ান করে তোলে। গোটা প্রদেশের মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ১৯৫৩ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত হয়েছে শহীদ দিবস হিসেবে। তখন কালো ব্যাজ ধারণ করা হতো এই দিনে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাক হানাদার বাহিনী আক্রমণের প্রথম প্রহরে ট্যাংকের গোলা দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল শহীদ মিনার। কেননা তারা জানত যে, এই শহীদ মিনার বাঙালির সংগ্রামের প্রেরণার উৎস। তাই তারা ইট-সিমেন্টের নির্মিত মিনারটি দেখে আতঙ্কিত হয়েছিল। স্বাধীনতার পর শহীদ দিবস নতুন মাত্রা পেল। শহীদদের জন্য আমরা শোকাহত হই কিন্তু তারচেয়ে বেশি গর্ববোধ করি। সর্বস্তরের জনতা শহীদ মিনারে গিয়ে নতুন করে শপথ গ্রহণ করে, পায় নতুন প্রেরণা। আজ এটি মহাজাতীয় অনুষ্ঠান। ভাষা আন্দোলন শুধু রাষ্ট্রভাষার দাবি ছিল না। এটি বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম সোপান। এর মাধ্যমেই পাকিস্তান সম্পর্কে মোহ কেটে যায়। বাঙালিরা উপলব্ধি করে যে, তারা এক সাম্রাজ্যবাদের শাসন থেকে মুক্ত হয়ে আরো নিম্নমানের ঔপনিবেশিকদের খপ্পরে পড়েছে। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে তারা যুক্তফ্রন্টকে ভোট দেয়, যারা ২১ দফাকে নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো হিসেবে উপস্থাপিত করেছিল। যুক্তফ্রন্ট ২৩৭টি মুসলিম আসনের ভেতর ২২৮টি আসনে জয়লাভ করে। কিন্তু বাঙালির দুর্ভাগ্য যে, যুক্তফ্রন্ট ঐক্য ধরে রেখে বাংলার মুক্তির জন্য কাজ করতে ব্যর্থ হয়। নিজেদের মধ্যে বিভাজন এবং কলহ বাঙালির স্বপ্নকে চুরমার করে দেয়। এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৯৭ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। এরপর থেকে অর্থাৎ ১৯৯৮ সাল থেকে এই দিবসটি বিশ্বব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। ইউনেস্কোর সিদ্ধান্তের ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনকে একটি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সাফল্যের পেছনে অনেক ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেমন ‘তমদ্দুন মজলিশ’ নামে তৎকালীন একটি প্রতিষ্ঠানেরও বেশ অবদান রয়েছে। এই স্বল্প পরিসরে সবার নাম উল্লেখ করা সম্ভব নয়। তাছাড়া এই কলামে ভিন্ন কিছু বক্তব্য উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। যেটি বর্তমান বাংলা একাডেমির মূল ভবন, এটি সে সময় ‘বর্ধমান হাউস’ নামে পরিচিত ছিল। ছাত্রহন্তা মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন এই বাড়িতে থাকতেন। তখন এটি ছিল মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাস ভবন। যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার একটি দফায় বলা হয়েছিল যে, এই ভবনটিতে বাংলা ভাষার চর্চা এবং উৎকর্ষের জন্য বাংলা একাডেমি স্থাপন করা হবে। যেটি বাস্তবায়িত হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি ভবন নতুনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। তবে যে আদর্শ এবং উদ্দেশ্য নিয়ে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে দিকটায় তেমন সাফল্য আসছে না। যেমন সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করা। এখনকার বাংলা একাডেমি রুটিনমাফিক কাজ করে চলেছে। এর অবশ্য অন্যতম প্রধান কারণ যে বাংলা একাডেমি অতিমাত্রায় সরকারি নিয়ন্ত্রণে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তখন তাদের দলীয় পছন্দ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে। ফলে অনেক সময় দেশের খ্যাতনামা কবি-সাহিত্যিকের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না এবং পুরস্কার দেয়ার ব্যাপারেও সেই দুঃখজনক মানসিকতার প্রতিফলন ঘটে। আর সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করার ব্যাপারে বাংলা একাডেমির পক্ষে নিজস্ব কোনো উদ্যোগ নেয়া কঠিন, কেননা এ ব্যাপারে সরকারের কোনো আন্তরিকতা নেই। ২১ ফেব্রুয়ারিকে বাৎসরিক মহানুষ্ঠানে আবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। সেদিন যে পরিমাণ পুষ্পার্ঘ্য দেয়া হয়, তা ওজন করলে দেখা যাবে যে, কয়েকশ টন হয়েছে। বেশ কয়েকটি এফএম ব্যান্ডের রেডিওর অনুমতি দেয়া হয়েছে। সেসব শুনলে দেখা যাবে যে, ইংরেজি-বাংলার জগাখিচুড়ি। সেখানে তারা ফ্যাশন করে উচ্চারণ করতে গিয়ে ‘র’-এর উচ্চারণ ‘ড়’ করে ফেলছে- এরকম আরো অনেক বিকৃতি ঘটানো চলছে। তবে এত কিছুর পরও জাতি চিরকাল ২১ ফেব্রুয়ারিকে স্মরণ করবে একটি মহাদিবস হিসেবে, কেননা এদিন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার রাষ্ট্রীয় চক্রান্তকে বুকের রক্ত দিয়ে তরুণরা প্রতিহত করে। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের যাত্রা শুরু এই ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। ভাষা শহীদসহ সব শহীদকে স্মরণ করি।
(সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ : সাবেক ইপিসিএস ও কলাম লেখক।)

Scroll To Top

Design & Developed BY www.helalhostbd.net