শিরোনাম
গুলশান হামলার ১০ পর্যবেক্ষণ

গুলশান হামলার ১০ পর্যবেক্ষণ

Tabarakul Islam

মো: তবারুকুল ইসলাম

গুলশানের জিম্মি পরিস্থিতির শ্বাসরুদ্ধকর ১৩ ঘন্টা শেষে ১৩ জন মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। কমান্ডো বাহিনীকে এই ১৩টি প্রাণ রক্ষার কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়ে শেষ করা যাবে না।সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এই ঘটনায় ২০ বিদেশি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। নিহত হয়েছেন দুই পুলিশ কর্মকর্তা।সবচেয়ে ভাবনার বিষয় হলো- গুলশানের ঘটনাটি বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদের যে নজির স্থাপন করে দিয়েছে এবং এর ফলে মানুষের চিত্তে নিরাপত্তাবোধ নিয়ে যে আশঙ্কার বিজ বুনে দিয়েছে, সে ক্ষতি অপরিসীম এবং সূদুর প্রসারী।
দেশের এই সংকটকালীন সময়ে জাতীয় ঐক্য জরুরি। কিন্তু জাতীয় ঐক্যের দোহাই দিয়ে এই ঘটনা নিয়ে সমালোচনা, মতামত কিংবা বিশ্লেষণ নিরুৎসাহিত বা থামিয়ে দেয়া কি যৌক্তিক? দেশ ও দেশের মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে আইনশৃংখলা বাহিনী ও সরকারের গলদগুলো নিয়ে আলোচনা জরুরি।

১. কোনো মাতম উঠলো না
এ রকম একটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে দেশব্যাপী মানুষের মধ্যে মাতম উঠে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হামলায় তেমন কিছু দেখা গেল না। কারও কারও প্রতিক্রিয়ায় বরং উচ্ছাস ঝরে পড়ছিলো। তাদের ভাবখানা এমন- ‘আইএস নাই, আইএস নাই, দেখ এবার আইএস আছে কি নাই।’ কারও মতে, ‘সরকার যে পথে চলছে, তাতে এমনটা ঘটাইতো স্বাভাবিক।’ সরকারের প্রতি সংক্ষুব্ধ মানুষের প্রতিক্রিয়া আরও ভয়াবহ। তাদের মতে, ‘দেশ গোল্লায় যাক, তবু এই সরকারের একটা শিক্ষা হোক।’

২. ঘটনা শেষ হওয়ার আগেই রায় দেয়া শেষ
ঘটনার শুরু থেকেই সরকার সমর্থকরা বলতে লাগলেন, এটা বিএনপি-জামায়াতের কাজ। দেশে কোনো আইএস নাই। আর বিএনপি-জামায়াত সমর্থকরা বলছেন, ‘এটা একটা নাটক। ভারতীয় বাহিনীকে বাংলাদেশে ডেকে আনার জন্য সরকার এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে। অথবা ভারত শেখ হাসিনা সরকারকে আরও বেশি অনুগত ও বাধ্যগত করতে এমনটি করিয়েছে।’ এমন আগাম রায় দেশ, জনগণ কিংবা রাজনীতি- কোনো কিছুর জন্যই মঙ্গলজনক নয়।

৩. ধাক্কা খেল পুলিশ
গুলশানের ঘটনায় চরম ধাক্কা খেয়েছে পুলিশ। সাধারণ বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্মম অত্যাচার আর কথার আগেই গুলি চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অভ্যস্ত হয়ে উঠা পুলিশ বাহিনী আন্দাজও করতে পারেনি গুলশানের ঘটনার ভয়াবহতা। গতানুগতিন বিবেচনায় পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে দুইজন পুলিশ কর্মকর্তা প্রাণ দিয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩০ জনের বেশি।

৪. এতদিন তবে কাদের ধরা হলো?
গত ছয় বছর ধরেই জঙ্গি নির্মূল করছে এই সরকার। এই তো কদিন আগে তিনদিনে প্রায় ১৪ হাজার মানুষকে আটক করা হলো। তারপরও এই হামলা কী করে হলো? অনেকটা বিরতিহীনভাবে হত্যাকাণ্ড কারা ঘটাচ্ছে? বাংলাদেশ কি তবে জঙ্গি আর সন্ত্রসীতে ছেয়ে গেছে? নাকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গিদমনের নামে সরকারের বিরোধীপক্ষকে দমনে আটক অভিযান চালিয়েছে? যদি দেশ জঙ্গিতে ছেয়ে যায়, সেই ব্যর্থতা কি এই সরকারের নয়?

৫. গোয়েন্দারা কী করলো?
দেশের গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত এলাকায় এতবড় সন্তাসী হামলা হয়ে গেল। অথচ আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দারা আগাম কিছুই জানতে পারলো না? এত অস্ত্র, বিস্ফোরক নিয়ে সাত/আট জন সন্ত্রাসী কী করে যাতায়ত করতে পারলো? এ জন্য কী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দাদের জবাবদিহি হওয়া উচিত নয়?

৬. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোথায়?
এতবড় ঘটনা ঘটে গেল, দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখার দায়িত্ব যার, সেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে কিছুই শুনতে পেলাম না। সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ-বিদ্রোহ দমনে বিপুলভাবে সফল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সন্ত্রাসী হামলা মোকাবেলায় কতটুকু প্রস্তুত- সেটা জনগণকে জানানো জরুরি। দেশ ও দেশের মানুষকে নিরাপদ রাখতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উচিত ছিল সরকারের পদক্ষেপগুলোর বিষয়ে পরিষ্কার করা।

৭. সেনাবাহিনী ডাকতে কি কিছুটা দেরি হলো?
রাত দশটার দিকে পুলিশ হতাহত হওয়ার মধ্যদিয়ে ঘটনার ভয়বহতা প্রমাণ হয়েছে। এরপর সেনাবাহিনীকে তাৎক্ষণিক মাঠে নামানো উচিত ছিল। যে কারণেই হোক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চূড়ান্ত সাড়া দিতে যে বিলম্ব হয়েছে, তা মোটেই কাম্য ছিল না।

৮. প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য
প্রধানমন্ত্রী বরাবারের মত এবারও বেশ দৃঢ়তা নিয়ে পরিস্থিতি তদারক করেছেন বলে জানা যায়। কিন্তু তাঁর বক্তব্যে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যের ডাক থাকলে ভাল হতো। ভবি্ষ্যতে এই ধরণের ঘটনা রোধে পরিকল্পনা ও পদক্ষেপের কথা জানালে জনগণ কিছুটা আশ্বস্ত হতে পারতো।

৯. উন্নত দেশের কাতারে বাংলাদেশ
অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স কিংবা বেলজিয়ামের মত উন্নত দেশগুলোতে জিম্মি পরিস্থির ঘটনা আমরা দেখেছি। মনে করা হতো-পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোতেই কেবল এ ধরণের ভয়ঙ্কর হামলা ঘটতে পারে। গুলশানের ঘটনা বাংলাদেশকে সেইসব উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে গেছে। এই উন্নতি অবশ্য ভয়ঙ্কর এবং অনাকাঙ্খিত।
তবে এই ঘটনার মধ্যদিয়ে আমাদের সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বাংলাদেশকে ইউরোপ-আমেরিকার সাথে তুলনার আরও একটি মওকা পেয়ে গেলেন। তারা প্রায়ই বলেন, খুন খারাবি তো ব্রিটেন-আমেরিকাতেও হয়। এখন তারা বলবেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম কিংবা অস্ট্রেলিয়াতেও সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটছে।
তাদের কথায় মনে হয়, উন্নত দেশ হতে গেলে হত্যাকাণ্ড আর সন্ত্রাসী হামলার খুব দরকার।

১০. আস্থা অর্জন জরুরি
সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। কাজে-কথায় প্রমাণ করতে হবে তারা জনগণের সেবক। অন্যথায় তাদের কোনো ব্যাখা মানুষ বিশ্বাস করতে চাইবে না। নিজের মত করেই সব ঘটনার সারমর্ম বুঝে নেবে। এটা দেশের জন্য ভয়ঙ্কর। এই আস্থাহীনতাই গুলশানের ঘটনায় মাতম না উঠার বড় কারণ।

লেখক: প্রথম আলো’র লন্ডন প্রতিনিধি

লন্ডন, ২ জুলাই

Scroll To Top

Design & Developed BY www.helalhostbd.net