শিরোনাম

মেঘের সাথে আড়ি (বাংলাদেশ বিমানে ভ্রমণের সময়)

মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া

kib-prof

শিরোনামটি একটি বাংলা টেলিফিল্মের।
টেলিফিল্মের প্রসঙ্গে পরে আসি।
সেপ্টেম্বরের আঠারো তারিখ দেশে যাচ্ছি, এটা অনেক আগেই নির্ধারণ করা ছিলো। প্রায় মাসখানেকের প্রস্তুতি। যাচ্ছি প্রায় পাঁচ বছর পর। অনেকেরই নানান আব্দার। আব্দার মেটানোর চেষ্টায় দিনকে রাত আর রাতকে তিন বানিয়ে চলছে উন্মত্ত প্রস্তুতি।
আকাশে শান্তির নীড় (বিমান) এর যাত্রী হয়েছি। সরাসরি হিথ্রো টু ঢাকা ভায়া সিলেট। অর্থ্যাৎ, প্রথমেই আকাশের সাদা বলাকা সিলেট এম এ জি উসমানী-তে অবতরণ করবে। ষোল তারিখের জনমত প্রকাশিত হবার প্রচেষ্টায় শামিল ছিলাম। কিন্তু সেদিন একটু আগেভাগেই অফিস ত্যাগ করি। তুমুল বৃষ্টিতে বেরুবার আগে সাঈম চৌধুরীর ছাতাটি চেয়ে বিমুখ হলাম। কিনু ভাইর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, নাজমুল, অপু আর মুবিনের কাছ থেকে অন্তত: পাঁচবার বিদায় নিলাম। বেরুলাম বৃষ্টি মাথায় নিয়ে, ইচ্চেছ অসবর্ন স্ট্রিট থেকে ২৫ নম্বরে হোয়াইটচ্যাপেল, তারপর ট্রেন। ভিজতে ভিজতে কিছু দূর যাবার পরই অভ্যেস বশত: পকেটে হাত দিয়ে দেখি মোবাইল নেই। ফের জনমতে।
মোবাইল চেয়ারে পড়েছিলো। এই সুযোগে আবারো বিদায় নিলাম।
আবারো বৃষ্টিতে ভেজা। এত তাড়া ছিলো যে আর কোন দিকেই তাকাইনি। আসলে সেদিন ছিলো ক্যাব স্ট্রাইক।
অসবর্ন রোড থেকে ২৫ নম্বরে উঠবো। মোবইলের এ্যাপসে বাস টাইম চেক করে দেখি ৪ মিনিট বাকি। ভাবলাম বৃষ্টিতে ভেজার চেয়ে অপেক্ষাই ভালো। বাস আসলো ৬ মিনিট পর। আসলে একটি যথাসময়ের সাক্ষাতের তাড়নায় আর কোনও দিকে তাকানোর দায় ছিলো না। আর ছিলো না বলেই কঠিন ধরা খেলাম। শেষ পর্যন্ত ইস্ট লন্ডন মস্ক বাস স্টপেই নামলাম। নেমেই বৃষ্টিতে ভিজে-দৌড়। দৌড়াতে দৌড়াতে কাকভেজা হয়ে ট্রেন ধরলাম।
পরের দিন বৃহস্পতিবার। কিন্তু, আমি এটা সেটা গোছাতে গোছাতেই সময় পার। সোয়া চারটায় কাজে গেলাম। কিন্তু কোনভাবেই মন বসাতে পারলাম না। জাকারিয়া আর আলস্টনকে ম্যানেজ করে গেলাম ম্যানেজারের কাছে। আগেই বেরিয়ে পড়লাম।
বেরুতে না বেরুতেই কবিরের ফোন। সকাল দশটা থেকে এগারোটার ভেতরে স্ট্র্যাটফোর্ড যেতে হবে। সাথে জাভেদ, খালেদ ও আরো দুজন। তড়িঘড়ি শুতে গেলাম। শুতে না শুতেই দুঃস্বপ্ন। স্বপ্নে এসে ইয়া বড় এক খরগোস কামড়ে গেলো। ঘুম ভাঙ্গার পর জোড় করে আবারো ঘুমাতে চেষ্টা করলাম। খুব একটা ভালো ঘুম হলো না। ঘুম ভাঙ্গলো সাতটায়। প্রথমেই মনে হলো, সন্ধ্যা সাড়ে আটটায় -আকাশে শান্তির নীড়। তারপর মনে হলো কবিরের সাথে এপয়েন্টমেন্টের কথা। মনে পড়লো অপুর কাছ থেকে ল্যাপটপ সংগ্রহ করতে হবে। নাস্তা সাড়তে না সাড়তেই সোয়া নয়টা। এমন সময় আমাদের বাংলার জাকির ভাইর ফোন। তার অপেক্ষায় পনের মিনিট কাটলো। বেরুলাম। একশো চারে করে স্ট্র্যাটফোর্ড। কবিরের সাথে শ্রেফ পনের মিনিটের সাক্ষাতকারটি শেষ পর্যন্ত দুই ঘন্টায় গড়ায়। এর ভিতরে সারে বারোটায় অপুর ফোন। ট্যাক্সট করে বললাম, বিশ মিনিট। অপুর উত্তর, ওহ মাই গড, হোয়াট উইল আই ডু দিস টোয়েন্টি মিনিটস।
সাক্ষাৎকারের ফাঁকেই তাকে জানালাম, ভাই আমার, প্লিজ।
শেষ পর্যন্ত সে ঠাণ্ডা হলো।

একটায় বেরিয়ে অপুকে ফোন দিলাম। এমন সময় বৃষ্টি, বৃষ্টি আর বৃষ্টি। একদম গোটস এন্ড কাউ রেইন। কাউন্সিল অফিসের কৃপন আড়ালে একটুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। হাতে সিগারেট ছিলো। বৃষ্টিতে ভিজে একদম সাড়া।
অপুর কাছ থেকে ল্যাপটপ নিয়েই দৌড়। একশ চারের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে শেষ পর্যন্ত অন্য বাসে প্লাস্টো, পরে ট্রেনে ইস্টহ্যাম। বৃষ্টি কিন্তু ঝড়ছে। সাথে পাসপোর্ট, সকল সার্টিফিকেট, জরুরি কাগজপত্র এবং অফিসের ল্যাপটপ। একটু দ্বিধায় ছিলাম। ভিজে সব বরবাদ হয় কি না আবার। শেষ পর্যন্ত ঘরে ফিরলাম আড়াইটায়। সাড়ে তিনটায় বেরুবো। রেডি হবার ফাঁকে হঠাৎ মনে পড়লো আগের দিন দীনেশ বলছিলো, এখন হজ্বের সময়। ফ্লাইট ঠিকমতো হয়, নাকি দুদিন হিথ্রোতে থাকতে হয় কে জানে! সে আসলে বাংলাদেশ বিমানের দুর্নামের কথা শুনে মন্তব্য করছিলো।
আমি সহসাই একটু চিন্তিত হলাম। সত্যিইতো, হজ্বের সময়। ফ্লাইট যদি সময়মতো না হয়!
বেরুলাম। আকাশ কাঁদছিলো। আমার মনটাও ভেজা। আবার চুপিসারে কিছুটা রোদেলা সুখও অনুভব করছিলাম। কারণ, এখনো ভাবি, বাংলাদেশই আমার দেশ। ভবিষ্যতের কথা জানি না। অনেককেই তো বাংলাদেশে না গিয়ে টার্কি, মরিশাস, আরব, ফ্রান্স ইত্যাদি দেশে হলিডে বানাতে দেখি।
ত্রিশ কেজিটাকে টেনেটুনে গাড়িতে ওঠালাম। জানালায় বাই বাই শব্দের রসায়ন চোখদুটো ভিজিয়ে দিচ্ছিলো।
এমন সময় হঠাৎ বৃষ্টি ধরে এলো। মেঘের আড়ালে লুকানো সূর্যটা লাজুক বধুর মতো গোমটা মাথায় দেখা দিলো। কড়া না হলেও রোদের উত্তাপটুকু সহসাই মনে করিয়ে দিলো, আজ হয়তো আকাশে শান্তির কোন সমস্যা হবে না। যেতে যেতে আফগানির সাথে বিশ্ব রাজনীতির (এখনতো সিরিয়া ছাড়া আর কোন কথাই নেই) মাথ চিবালাম। প্রচণ্ড ট্রাফিক ছিলো। শেষ পর্যন্ত ৬টার সময় হিথ্রোতে পৌছূলাম। চেক ইন করিয়ে খাবারের সন্ধানে দৌড়ালাম। একটা কিছু পেটে দিতে হবে। ক্ষিধায় প্রাণ ওষ্ঠাগত প্রায়। খেয়ে দেয়ে সিকিউরিটি চেকের জন্য গেলাম। দ্রুতই হলো। তারপর বাইশ নম্বর গেট।
এখানেই শুরু মেঘের সাথে আড়ি।
দোলাচলে দোলতে দোলতে বোর্ডিং পাস নিলাম। বাংলাদেশ বিমানের চেক ইন থেকে নিয়ে বোর্ডিং পাস পর্যন্ত একজনকে খুব বাংলা, হিন্দি, উর্দূ, ইংরেজি ইত্যাদিতে খুব তড়পাতে দেখলাম। মনে হচ্ছিলো, বাংলাদেশের পুলিশ, যারা বকা না দিয়ে কথা কহেনা। তাঁকে পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত বলাকার পেটে ঠাঁই নিলাম। সংশয়ে দুলতে দুলতেই আসন নিলাম। কয়েক মিনিটরে মধ্যেই হঠাত মনে হলো, আরে, এ যে দেখছি একান্তই নিজেদের পরিবেশ। সবাই কেমন হাসিখুশি, আন্তরিক; মনে হচ্ছিলো সকলকেই বুঝি চিনি। সবগুলো চেহারাই মনে হচ্ছিলো পুরাতন, অর্থাৎ, আগে কোথাও না কোথাও দেখেছি।
আমার মনে হলো, আমি যেন খুব ভালো একটি সময় কাটাতে যাচ্ছি। আসলে ভয়ের কোন উপলক্ষে যখন কোন ভয় থাকে না, বরং আনন্দ থাকে তখন মানুষের মনে যে এক ধরনের উৎফুল্লতা দেখা দেয়- আমি সেই ধরনের আনন্দ-বিহ্বলতায় ভাসছিলাম।
বৃষ্টির শেষে রোদের আগমন, সময়মতো পৌঁছা- ইত্যাদির পর বলাকার পালক আছে কি না, আকাশে সত্যিই শান্তির নীড় পাওয়া যাবে কি না, একটু আরাম করে বসা যাবে কি না ইত্যাদি ছোটখাটো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আর ভাবতে ইচ্ছে করছিলো না। মনে হচ্ছিলো, বসতে পেরেছি, সে-ই যথেষ্ট। কোন রকম ১০টি ঘন্টা না হয় কাটিয়ে দেয়া যাবে। সামনে পেছনে, ডানে বামে কেবলি পরিচিত শব্দ, চেনা ভাষার সুর, চেনা অনুভূতি- এমনকি চেনা কষ্টগুলোও ভীড় করছিলো।
ভ্রমণের সময় বাংলাদেশ বিমানের সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়। খাবারের মান, আসনের অবস্থা, এমন কি- যারা কাজ করছেন তারাও কেমন যেন যান্ত্রিক। খুব বেশি মাত্রায় একঘেয়ে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা এন্টারটেইনমেন্ট এর। সারাটা পথ পুরাতন যুগের রঙিন টেলিভিশনে একটিমাত্র টেলিফিল্ম  ঘুরেফিরে চলেছে।
টনি ডায়েস, তিশা আর নীরবের অভিনীত মেঘের সাথে আড়ি। হয়তো অটো পাইলটের মতো অটো ফিল্ম চালানোর কোনও সুবিধা রয়েছে। তাই, শেষ হবার পর আবারো সেই একই ফিল্ম চালু হচ্ছে।
তবে কাউকেই মনোযোগ দিয়ে টিভির স্ক্রিনের দিকে তাকাতে দেখলাম না। আসলে পরিবেশটার মধ্যে এমন এক আন্তরিকতা ছিলো যে কেউ কোন অভিযোগ করার মতো তুচ্ছতায় যেতে চান নি। হয়তো এ কারণেই লন্ডন-সিলেট ফ্লাইট নিয়ে যুক্তরাজ্য প্রবাসীদের এত আবদার। দীর্ঘ পথের যাত্রায় একঘেয়েমি থাকলে মানুষ খাবার-দাবার, বিনোদন, আসন ইত্যাদি নিয়ে অনুযোগ-অভিযোগ করে। কিন্তু, যাত্রা যেখানে একঘেয়ে হয়ে ওঠার সুযোগ পায় না, সেখানে এটা সেটা নিয়ে তেমন একটা অভিযোগ করার মানসিকতা থাকেনা।
হয়তো এটুকুই বাংলাদেশ বিমানের মূলধন। অন্যথায়, যদি সার্ভিসের কথা চিন্তা করা হতো, তাহলে হয়তো মানুষ আরো ভালো, যুগোপযোগী ও উপযুক্ত সার্ভিসের জন্য তুলকালাম কাণ্ড ঘটাতো।
(গল্পটি পুরাতন। তবে, সংবাদ২৪-এর জন্য নতুন)

Scroll To Top

Design & Developed BY www.helalhostbd.net